আবাসন খাত বাঁচলে বাঁচবে দেশের অন্যান্য শিল্প: সংশ্লিষ্ট খাতের বিশিষ্টজনেরা

আবাসন খাত বাঁচলে বাঁচবে দেশের অন্যান্য শিল্প: সংশ্লিষ্ট খাতের বিশিষ্টজনেরা ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৫:৪৪, ৯ অক্টোবর ২০২৬

খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান মানুষের মৌলিক চাহিদা। এর মধ্যে নিরাপদ আবাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। সাধ্যের মধ্যে নিজের একটি আবাস গড়ে তোলা অনেক মানুষের স্বপ্ন হলেও নানা কারণে তা সবার জন্য সহজ হয়ে ওঠে না। এ ক্ষেত্রে আবাসন কোম্পানিগুলো অনেকের জন্য বাসস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জে দেশের আবাসন খাত ক্রমেই চাপে পড়ছে। অর্থনীতির গতি সচল রাখতে এ খাতকে ঝুঁকিমুক্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা।

তাঁদের মতে, রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাত কেবল ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা ভবন নির্মাণের ব্যবসা নয়; এর সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক সহযোগী শিল্প, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সরাসরি জড়িত। তাই আবাসন খাতে মন্দা দেখা দিলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, স্যানিটারি পণ্য, সাজসজ্জা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট শিল্পে।

‘আবাসন খাত বাঁচলে বাঁচবে দেশের অন্যান্য শিল্প’—এই ধারণাকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও উৎপাদনমুখী শিল্পের গতি ধরে রাখতে আবাসন খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আড়াই শতাধিক সহযোগী শিল্প আবাসন খাতের ওপর নির্ভরশীল
আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় আড়াই শতাধিক সহযোগী ও উপশিল্প যুক্ত রয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে রড, সিমেন্ট, ইট, পাথর, বালু, সিরামিক ও টাইলস উৎপাদন এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।

এ ছাড়া রং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্প, বৈদ্যুতিক তার, সুইচ-সকেট, লাইটিং, পাইপ এবং স্যানিটারি ফিটিংসের ব্যবসাও আবাসন খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন খাতে মন্দা দেখা দিলে কিংবা ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি কমে গেলে এসব সহযোগী শিল্পে চাহিদা হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়া, ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হওয়া এবং সামগ্রিক শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
দেশের নির্মাণ ও আবাসন খাত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। প্রকৌশলী, স্থপতি, প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান ও সাধারণ নির্মাণশ্রমিক—বিভিন্ন পেশার মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসন খাতের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় স্থবির থাকলে কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের আয় এবং সহযোগী শিল্পের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব বৃহত্তর অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আবাসন খাতের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সংকট উত্তরণে চারটি প্রস্তাব
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়নে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

নীতিগত সহায়তা: বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ব্যবসা পরিচালনায় নিশ্চয়তা দিতে স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

সহজ শর্তে গৃহঋণ: ক্রেতা ও ডেভেলপার—উভয় পক্ষের জন্য সহজ শর্তে এবং তুলনামূলক কম সুদে গৃহঋণ ও অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে আবাসন কেনা এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক চাপ কমতে পারে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব: আবাসন খাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্মাণসামগ্রীর দাম নিয়ন্ত্রণ: রড, সিমেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার তদারকি ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, নির্মাণ ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা গেলে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ক্রেতাদের জন্য ফ্ল্যাটের মূল্য সাধ্যের মধ্যে রাখার সুযোগ বাড়তে পারে।

আবাসন খাতের বিকাশে সময়োপযোগী পদক্ষেপের প্রত্যাশা
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা, সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা আবাসন খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। তাঁদের মতে, এ খাতের উন্নয়ন শুধু নতুন ফ্ল্যাট বা ভবন নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং অসংখ্য ছোট-বড় ব্যবসার ভবিষ্যৎ।

তাই আবাসন খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর কার্যক্রম সচল রাখা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে।

 
শেয়ার করুনঃ
Advertisement