‘রাজকন্যা’ তুবার ভালোবাসায় বদলে গেল খুঁটিতে বাঁধা অনিকের জীবন
Published : ০১:৩২, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চুরির চেষ্টার অভিযোগে বাজারের খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ছিলেন বাবা। অভুক্ত বাবার কাছে এক কাপ চা ও রুটি নিয়ে ছুটে আসে ছোট্ট মেয়ে তুবা। এরপর নিজের হাতে রুটি টুকরো করে বাবাকে খাইয়ে দেওয়ার সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শিশুটির নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সেই মুহূর্তই বদলে দিয়েছে অনিক সিকদার ও তার পরিবারের জীবনের গল্প।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারে শুক্রবার রাতে চুরির চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়রা অনিক সিকদারকে আটক করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। খবর পেয়ে তার ছোট্ট মেয়ে তুবা বাবার কাছে ছুটে যায়। সঙ্গে ছিল এক কাপ চা ও একটি রুটি। নিজের হাতে রুটি টুকরো করে সে বাবার মুখে তুলে দেয়।
বাবার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার করার বয়স হয়নি তুবার। তার কাছে বাবা তখন শুধু একজন ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষ। শিশুটির সেই মানবিক আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, একসময় অনিকদের পরিবার স্বচ্ছল ছিল। বাবার অসুস্থতার পর চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে ধীরে ধীরে পরিবারের সঞ্চয় ও সম্পদ শেষ হয়ে যায়। এরপর তাদের জীবনে নেমে আসে নানা সংকট।
অনিকের পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে তিনি নেশায় জড়িয়ে পড়েন এবং স্থানীয় একটি মাদকচক্র তার দুর্বলতার সুযোগ নেয়। এর মধ্যেই বামরাইল বাজারে চুরির চেষ্টার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
অনিকের স্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অভাব-অনটনের কারণে তাদের সংসারে নানা সমস্যা চলছিল। মেয়েটি বাবাকে খুব ভালোবাসে। সেদিন বাবাকে ওই অবস্থায় দেখে সে পাশে গিয়ে দাঁড়ায় এবং নিজের হাতে খাবার খাওয়ায়।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার অনিকের বাড়িতে যান উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলী সুজা। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, তুবার পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। একই সঙ্গে অনিক যাতে কাজ করে পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারেন, সে জন্য কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইউএনও আলী সুজা বলেন, শিশুটির ভবিষ্যৎ যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে। অনিককেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে অনিকের কর্মসংস্থানে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে এসেছে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উই আর বাংলাদেশ (ওয়াব) ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে তাকে একটি ভ্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অনিক আয় করে পরিবারের ব্যয় চালাতে পারবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়াব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পুলিশ সদস্য এসএম আকবর বলেন, অনিকের প্রয়োজনের সময়ে যতটুকু সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রয়োজন, তাদের সংগঠন সামর্থ্য অনুযায়ী তা অব্যাহত রাখবে।
অনিক সিকদার বলেন, তার কোনো ভুল হয়ে থাকলে ভবিষ্যতে আর কোনো অন্যায় করবেন না। কাজ করে পরিবারকে ভালোভাবে চালাতে চান তিনি। মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সবার সহযোগিতা চান।































