জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, নাকি তৈরি হবে নতুন সিন্ডিকেট?

জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, নাকি তৈরি হবে নতুন সিন্ডিকেট? ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৪:২৩, ১৬ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি অনেকটাই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর। শিল্প উৎপাদন, কৃষির সেচ, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন—প্রায় প্রতিটি খাতেই জ্বালানি তেলের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মূল্য শুধু একটি বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পের উৎপাদন খরচ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ভূমিকা রয়েছে। এর কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ আয়োজিত এক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে সরকার অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর আওতায় যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এর ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। তবে প্রশ্ন হলো—বেসরকারি খাতের প্রবেশ কি সত্যিই প্রতিযোগিতা বাড়াবে, নাকি পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের অভাবে নতুন ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে?

প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা
বেসরকারি আমদানিকারক যুক্ত হলে জ্বালানি তেলের বাজারে একাধিক উৎস তৈরি হতে পারে। বর্তমানে আমদানি ব্যবস্থায় কোনো একটি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সরবরাহে বিলম্ব হলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। একাধিক আমদানিকারক থাকলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ বাড়বে এবং একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যায় পুরো বাজারে সংকট তৈরির সম্ভাবনা কমতে পারে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে নমনীয় হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত ক্রয়াদেশ দেওয়া, বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজা কিংবা পরিবহন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।

তবে প্রতিযোগিতার সুফল তখনই পাওয়া যাবে, যখন বাজারে পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।

সরবরাহ নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
জ্বালানি তেল সাধারণ কোনো ভোগ্যপণ্য নয়। এর সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও শিল্প, পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই বেসরকারি খাতকে আমদানির সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি কমিয়ে দিলে যাতে দেশের বাজারে সংকট না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রকে জরুরি সরবরাহের ‘ব্যাকআপ’ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে।

এ ক্ষেত্রে বিপিসির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সরাসরি সব ধরনের ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, কৌশলগত মজুত ও জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

অবকাঠামোতে বিনিয়োগের সুযোগ
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের অন্যতম বড় সম্ভাবনা রয়েছে জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে। নতুন আমদানিকারকরা টার্মিনাল, স্টোরেজ, পাইপলাইন, পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা পরিশোধনাগারে বিনিয়োগ করতে পারে।

আধুনিক ও বড় আকারের স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে আন্তর্জাতিক বাজারে অনুকূল সময়ে জ্বালানি কিনে সংরক্ষণ করার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর অবকাঠামো বিনিয়োগের চাপও কমতে পারে।

মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা জরুরি
বেসরকারি আমদানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—ভোক্তার জন্য জ্বালানির দাম কীভাবে নির্ধারিত হবে?

আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয়, পরিবহন, সংরক্ষণ, কর এবং ব্যবসায়িক মুনাফা—সবকিছুর সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য মূল্য নির্ধারণ সূত্র প্রয়োজন।

নিয়ম পরিষ্কার না হলে বেসরকারি আমদানির সুযোগের আড়ালে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, কৃত্রিম সংকট কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রভাব
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে জ্বালানি আমদানি করলেও এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত আমদানি হলে ডলারের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই বেসরকারি আমদানিকে পুরোপুরি আলাদা একটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে না দেখে আমদানির পরিমাণ, সময় ও উৎসের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সমন্বয় রাখা দরকার।

সরকারি একচেটিয়ার বদলে বেসরকারি একচেটিয়া নয়
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—সরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থার পরিবর্তে যদি হাতে গোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি নাও হতে পারে।

বরং নতুন ধরনের সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও মূল্য কারসাজির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি তেলের দাম কমার পরিবর্তে উল্টো বাড়ার সম্ভাবনাও থাকবে।

তাই লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, অবকাঠামো, সংরক্ষণ ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তথ্য প্রকাশ ও নজরদারি
বেসরকারি আমদানির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি চালানের ক্রয়মূল্য, উৎস, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য চার্জ যাচাইযোগ্য করা যেতে পারে।

নিয়মিত তথ্য প্রকাশ এবং স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থা থাকলে অনিয়ম ও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ কমবে।

একই সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রতিযোগিতা কমিশন এবং অন্যান্য অংশীজনের সমন্বয়ে শক্তিশালী বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ভারতের অভিজ্ঞতা কতটা প্রাসঙ্গিক?
ভারতে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও নায়ারা এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন ও বাজারজাত করছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একই বাজারে প্রতিযোগিতা করছে।

তবে ভারতের মডেল সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। ভারতের বাজার অনেক বড় এবং দেশটির নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা, বন্দর অবকাঠামো ও ভোক্তা বাজারও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বিস্তৃত।

বাংলাদেশের জন্য ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব বাজার, অবকাঠামো ও জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মডেল তৈরি করাই হবে বাস্তবসম্মত পথ।

দেশে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ
দীর্ঘমেয়াদে শুধু পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর না করে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

নতুন রিফাইনারি, টার্মিনাল, স্টোরেজ ও পাইপলাইন নির্মাণে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কার্যকর হতে পারে।

দেশে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়লে মূল্য সংযোজন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাষ্ট্রের ভূমিকা বদলাতে হবে
বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার অর্থ রাষ্ট্রের ভূমিকা কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং রাষ্ট্রের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে—কে আমদানি করবে, কত পরিমাণ আমদানি করবে, কোথায় সংরক্ষণ করবে, কত দিনের বাধ্যতামূলক মজুত রাখতে হবে এবং কীভাবে মূল্য নির্ধারিত হবে।

অর্থাৎ রাষ্ট্র সরাসরি সব ব্যবসা পরিচালনা না করেও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাজারের প্রতিযোগিতা, ভোক্তার স্বার্থ এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাই হতে পারে সমাধান
জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতের প্রবেশকে একদিকে যেমন বাজার সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে তেমনি এর ঝুঁকিগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বেসরকারি অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমদানি দক্ষতা বাড়তে পারে, সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি হতে পারে, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।

কিন্তু দুর্বল নিয়ন্ত্রণ থাকলে সরকারি একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও মূল্য কারসাজির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্র ব্যবস্থা—যেখানে বিপিসি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে থাকবে, আর যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে আমদানি ও বাজারজাতকরণে অংশ নেবে।

জ্বালানি তেল শেষ পর্যন্ত শুধু একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই বেসরকারি খাতকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও জবাবদিহির কাঠামোকেও শক্তিশালী করতে হবে।

শেষ প্রশ্ন তাই থেকেই যায়—বেসরকারি খাতের প্রবেশে জ্বালানি বাজারে সত্যিকারের প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, নাকি সরকারি একচেটিয়ার জায়গায় জন্ম নেবে নতুন কোনো সিন্ডিকেট?

 
শেয়ার করুনঃ
Advertisement