যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজারে অস্থিরতা, বিপিসির ১৮,৬৯৯ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে চিঠি
Published : ২০:৫৪, ১২ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সমপরিমাণ ভর্তুকি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, বিপণন ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, জাহাজভাড়া, বীমা এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে দেশের বাজারে নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের কারণে এ লোকসানের মুখে পড়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকির কারণে পরিবহন ও বীমা ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। তবে দেশের বাজারে একই হারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না হওয়ায় বিপিসিকে আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম দামে তেল বিক্রি করতে হয়েছে।
বিপিসির হিসাবে, যুদ্ধের আগে ডিজেলের গড় আমদানি মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৬ মার্কিন ডলার, যা জুনে বেড়ে ১২০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে অকটেনের দাম ৭৩ ডলার থেকে ১০৪ ডলারে উন্নীত হয়। জুনের শেষদিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও জুলাইয়ে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
মন্ত্রণালয়ের ২৮ জুলাইয়ের চিঠি অনুযায়ী, মার্চে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২,২৪৮ কোটি টাকা, এপ্রিলে ৭,৮৬৬ কোটি টাকা, মে মাসে ২,৬২১ কোটি টাকা এবং জুনে ৫,৯৬৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চার মাসে মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৮,৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির সময় বিপিসি সরকারকে জানায়, প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে ২০৩ টাকা ৮৪ পয়সা, অর্থাৎ প্রতি লিটারে লোকসান ১০৩ টাকা ৮৪ পয়সা। একইভাবে প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও আমদানিতে ব্যয় হয় ১৫১ টাকা ৬১ পয়সা, ফলে প্রতি লিটারে লোকসান হয় ৩১ টাকা ৬১ পয়সা। সে সময় সংস্থাটি সতর্ক করেছিল, মূল্য সমন্বয় না হলে সম্ভাব্য লোকসান ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে সরকার ১৯ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়।
তবে মূল্য সমন্বয়ের পরও আন্তর্জাতিক বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় লোকসান অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের ওপর পুরো মূল্যবৃদ্ধির চাপ না দিতে সরকার ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
যদিও সাম্প্রতিক এই সংকটে বিপিসি বড় লোকসানের মুখে পড়েছে, তবু গত কয়েক বছরে সংস্থাটির আর্থিক অবস্থান ছিল শক্তিশালী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৪,২১৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৭৩ কোটি টাকা বেশি।
একই অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার ৯২৯ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার মোট ব্যয় ছিল ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় হয় ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা, আর ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯৮৫ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয় ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা।
বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানান, ভর্তুকির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুত এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ শুরু হওয়ার পর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিপিসি সরকারকে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা কর ও ভ্যাট দিয়েছে। পাশাপাশি সরকারের একটি বিশেষ তহবিলে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা জমা করা হয়েছে। বিপিসির মুনাফার বড় অংশ ভবিষ্যৎ প্রকল্প এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
































