রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে চাপে মুসলিমরা, ঐক্যের বার্তা দিলেন ইউক্রেনের মুফতি
Published : ১২:৩৬, ১৮ আগস্ট ২০২৬
রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনের মুসলিম সম্প্রদায়ও ব্যাপক সমস্যার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় নেতা মুফতি মুরাত সুলেইমানভ।
তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের মুসলমানদের ধর্মীয় প্রশাসনের প্রধান এই মুফতি বলেন, নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবন ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি মসজিদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুলেইমানভ বলেন, ইউক্রেনের মুসলমানরা প্রতিদিন এমন আশঙ্কা নিয়ে জীবনযাপন করছেন যে পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্রটি তাদের মসজিদ, বাড়ি কিংবা পাড়ায় আঘাত হানতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণা ও ইসলামি সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনে মুসলমানের সংখ্যা আনুমানিক ৫ থেকে ২০ লাখ। দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ অভিবাসী নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশ। ক্রিমিয়ান তাতাররা ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় মুসলিম সম্প্রদায়।
মুফতি সুলেইমানভ জানান, বাখমুত, সিভেরোদোনেৎস্ক ও কস্তিয়ান্তিনিভকায় মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে অনেক মুসলমান অন্য এলাকায় চলে গেছেন, যাতে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে থেকে নামাজ, জানাজা ও অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন।
তবে যুদ্ধের নানা সংকটের মধ্যেও অনেক মুসলমান ইউক্রেনেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ তারা নিজেদের দেশটির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন।
সুলেইমানভ বলেন, যারা ইউক্রেনে থেকে গেছেন, তারা বুঝতে পারছেন যে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারাও ইউক্রেনীয় সমাজের অংশ।
তার মতে, নিরাপত্তা এখন মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। প্রতিদিন ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ ও গোলাবর্ষণের মধ্যে জীবনযাপন যখন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়, তখন সবাই যুদ্ধের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠা চায়।
মুসলিম-খ্রিস্টান সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ
যুদ্ধ ইউক্রেনের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্পর্কেও নতুন মাত্রা তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন সুলেইমানভ। তার মতে, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ।
তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে অনেক সময় দুটি প্রধানত খ্রিস্টান দেশের মধ্যকার সংঘাত হিসেবে দেখা হয়। এ কারণে কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, ইউক্রেনের মুসলমানরা হয়তো নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায় স্পষ্টভাবে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে।
সুলেইমানভের ভাষায়, এর ফলে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
রাশিয়া মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে বিভাজন তৈরির জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে—এমন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ঐক্যই তাদের শক্তি। যখন বিশপ, পুরোহিত, মুফতি ও ইমাম একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলেন, তখন সেই ঐক্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গাজা নিয়েও কথা বলার দায়িত্ব রয়েছে: মুফতি
ইউক্রেনের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে যে ন্যায়বিচার ও ঐক্যের নীতি এক করেছে, অন্যান্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সেই নীতি অনুসরণ করা উচিত বলে মনে করেন সুলেইমানভ।
তিনি বলেন, ইউক্রেনের মুফতি এবং একজন মুসলমান হিসেবে ফিলিস্তিন ও গাজায় ‘গণহত্যা’ নিয়ে কথা বলাও তার দায়িত্ব।
তার মতে, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে বাছাই করা দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে বিশ্বনেতাদের সংলাপের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মুসলিম বিশ্বের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়ে সুলেইমানভ বলেন, ইউক্রেনের মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাদের প্রত্যাশা, ইউক্রেনের মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে আরও বেশি কথা বলা হবে।
তুরস্কের ধর্মবিষয়ক অধিদপ্তর দিয়ানেতের সঙ্গেও আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আশা প্রকাশ করেন তিনি। ইউক্রেনের মুসলমানদের সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দিয়ানেত সহযোগিতা করছে উল্লেখ করে ভবিষ্যতে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সুলেইমানভ।































