শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতি: মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পথচলা

শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতি: মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পথচলা ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৯:৪৬, ২০ আগস্ট ২০২৬

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ্যে ব্যালট গণনা করা হয়। গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনি কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।

রাজনীতির মাঠের বর্ষীয়ান এই নেতা পেশাজীবন শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা দিয়ে। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক থেকে রাজনীতির রাজপথ, ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলেন।

ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষকতা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ছাত্রজীবনে তিনি সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা আরও বাড়ে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।

দলীয় রাজনীতিতে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন মির্জা ফখরুল। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এর আগে ও পরে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

সংসদ ও মন্ত্রিসভায়

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মির্জা ফখরুল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। পরে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর মির্জা ফখরুল নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির মহাসচিব

২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। প্রায় পাঁচ বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এরপর থেকে দলটির অন্যতম প্রধান সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক মুখ হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিলেন।

খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার সময় এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন অবস্থানের সময়ে দেশে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল।

বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের সময় একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেছেন তিনি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ বিরোধী দলের আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার পর ১৩ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথ

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল।

৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেন দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই নেতা।

ব্যক্তিগত জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগত জীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।

শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পরে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় এসেছে নানা উত্থান-পতন। পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির মহাসচিব ও মন্ত্রী—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর এবার বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন অধ্যায় শুরু করলেন তিনি।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement