৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকায় ৫ হাজার ৮৩০ গাড়ি কিনবে সরকার
Published : ১৫:৪০, ২০ অক্টোবর ২০২৬
পুলিশের পরিবহন সংকট দূর করা, ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি প্রতিস্থাপন এবং বাহিনীর কার্যক্ষমতা বাড়াতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের ৬৩৯টি থানায় বর্তমানে গড়ে দুটি করে গাড়িও নেই। এ সংকট মোকাবিলায় দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে গাড়িগুলো কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ১ হাজার ৭৪টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ৪৫৫টি গাড়ি পুরোপুরি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুলিশের পরিবহন সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বর্তমানে থানাগুলোতে মোট ১ হাজার ২৩৭টি গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ গাড়ির বয়স ১০ বছরের বেশি। পুরোনো এসব যানবাহনের কারণে নিয়মিত টহল, অপরাধ তদন্ত ও জরুরি সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল গাড়ি কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৮ দশমিক ৯২৪৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত গাড়ি কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ২৮০ দশমিক ১৪১৪ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের অনেক গাড়ি পুড়ে যাওয়া বা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় টহল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পুলিশের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির পরিবর্তে নতুন যানবাহন সরবরাহে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত কেনাকাটার উদ্দেশ্য শুধু ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি প্রতিস্থাপন নয়; বরং পুলিশের সামগ্রিক পরিবহন সংকট দূর করা এবং বিশেষায়িত কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটি বাংলাদেশ পুলিশ ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে সরকার।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি থানার আওতায় সাধারণত একাধিক ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড থাকে। বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে টহল ও অন্যান্য কার্যক্রম চালাতে প্রতিটি থানায় অন্তত চার থেকে পাঁচটি পিকআপ বা টহল গাড়ি প্রয়োজন। জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় এর চেয়েও বেশি গাড়ির দরকার হতে পারে। কিন্তু অনেক থানায় মাত্র একটি বা দুটি গাড়ি থাকায় একদিকে অভিযান চালালে অন্য এলাকায় পর্যাপ্ত টহল বা তাৎক্ষণিক পুলিশি সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামারুম মুনিরা জানান, মূলত পরিবহন সংকট দূর করা এবং পুলিশের কার্যক্রম গতিশীল করতেই গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাহিনীর গাড়ির প্রয়োজনীয়তা আবার মূল্যায়ন করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও গাড়ি কেনার আবেদনও করা হতে পারে।
তিনি জানান, নিয়মিত টহল, অপরাধ ও মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার এবং জরুরি সেবা প্রদানে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন বা বড় কোনো আয়োজনের সময় দেশজুড়ে পুলিশকে একযোগে কাজ করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত যানবাহনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও প্রকল্প প্রস্তাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পের লক্ষ্য সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ তদন্ত এবং দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, রায়ট কার জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে। সাধারণ টহল গাড়ি চলাচল করতে পারে না—এমন দুর্গম এলাকায় কাজে আসবে অল-টেরেইন ভেহিকেল।
মোবাইল কমান্ড সেন্টার অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হিসেবে কাজ করবে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে এসব যান থেকে পুলিশের অভিযান পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া, ক্রাইম সিন ভ্যান অপরাধের পরপরই ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহে তদন্তকারীদের সহায়তা করবে, যা অপরাধ তদন্ত ও সন্দেহভাজন শনাক্তকরণে ভূমিকা রাখবে। নদীমাতৃক এলাকায় টহল, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়া এবং উদ্ধারকাজ পরিচালনায় জলযানের প্রয়োজনীয়তাও প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে।
নথিপত্রে দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানার পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের ২৪টি রেলওয়ে থানা ও ৭৩টি হাইওয়ে থানার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পে গাড়ি মেরামতের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া, ৬৫০ জন হালকা যানবাহন চালক ও ৩০০ জন ভারী যানবাহন চালককে ড্রাইভিং এবং মেকানিক্যাল প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আরও ৫০ জনকে আলাদাভাবে মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পের আওতায় ৯১০ জন কর্মীকে ড্রাইভিং ও মেকানিক্যাল প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আরও ৫০ জন মেকানিক প্রশিক্ষণ নেবেন।
গত ১৫ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি প্রস্তাব দুটি পর্যালোচনা করে। কমিটি প্রকল্পগুলোতে ব্যয়ের সঠিক প্রাক্কলন নিশ্চিত করা, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ এবং গাড়িগুলোর পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করেছে।
































