সোনারগাঁয়ে ১৪০ বছরের বেশি সময় ধরে পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত

সোনারগাঁয়ে ১৪০ বছরের বেশি সময় ধরে পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

Published : ১৭:১৬, ২০ অক্টোবর ২০২৬

‘ধর্ম যার যার, সম্প্রীতি সবার’—এই কথার বাস্তব প্রতিচ্ছবি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ইউসুফগঞ্জ এলাকা। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ ও একটি মন্দির। দুই ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করছেন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে।

এলাকাবাসী জানান, ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদের পাশেই রয়েছে শ্রী শ্রী সাধুবাবা সম্ভুনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৩ সাল থেকে মসজিদ ও আশ্রমকে ঘিরে এ অঞ্চলে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি থাকা দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নির্বিঘ্নে চলছে নিজ নিজ ধর্মের কার্যক্রম। স্থানীয়দের দাবি, এ সময়ে মসজিদ ও মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনো বিরোধ বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি।

এলাকার ব্যবসায়ী মামুন বলেন, আজানের সময় মুসল্লিরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন, আর নির্ধারিত সময়ে মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা। একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান রেখে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন। বিভিন্ন উৎসব ও আয়োজনে একে অপরকে সহযোগিতাও করেন তাঁরা।

ধর্মীয় গুরুদের মতে, ইউসুফগঞ্জের এই চিত্র কেবল দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অবস্থানের গল্প নয়; এটি দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিশ্বাস, সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব—ইউসুফগঞ্জ তারই বাস্তব উদাহরণ। যুগের পর যুগ ধরে গড়ে ওঠা সম্প্রীতির এ বন্ধন ভবিষ্যৎ প্রজন্মও অক্ষুণ্ন রাখবে বলে আশা স্থানীয়দের। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার এই সংস্কৃতি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অনুকরণীয় হয়ে থাকতে পারে।

মসজিদের মুসল্লি রিপন বেপারী বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে একসঙ্গে বসবাস করছি। মুসলমানরা মসজিদে নামাজ আদায় করছেন, আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরে পূজা-অর্চনা করছেন। এ নিয়ে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

একই অনুভূতির কথা জানান শ্রী শ্রী সাধুবাবা সম্ভুনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজয় দাশ হরি। তিনি বলেন, “আজানের সময় স্থানীয় মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, আবার পূজার সময় আমরাও কোনো বাধা ছাড়াই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ ধর্ম চর্চা করে আসছেন।”

ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মওলানা মো. মাহফুজ রহমান বলেন, “এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে পূজা-অর্চনা করে আসছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তাঁদের সব সময় সহযোগিতা করা হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এখানকার ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে।”

এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত বলেন, “বছরের পর বছর ধরে এখানে মসজিদ ও মন্দিরের কার্যক্রম সমানতালে পরিচালিত হয়ে আসছে। এ বছরও নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে বলে আমরা আশাবাদী। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সম্প্রীতির যে বন্ধন এখানে গড়ে উঠেছে, তা ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে।”

শেয়ার করুনঃ
Advertisement