একটি গণমাধ্যম বন্ধ হওয়ার গল্প: দায়টা কার, ভুলটা কোথায়?: আকরাম হোসেন

একটি গণমাধ্যম বন্ধ হওয়ার গল্প: দায়টা কার, ভুলটা কোথায়?: আকরাম হোসেন আকরাম হোসেন, হেড অব ডিজিটাল এনপিবি নিউজ। ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০১:১৯, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর মানেই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য সংবাদকর্মীর কর্মসংস্থান, তাঁদের পরিবার এবং ভবিষ্যৎ। নতুন গণমাধ্যমের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরে এমন মন্তব্য করেছেন এনপিবি নিউজের হেড অব ডিজিটাল আকরাম হোসেন

তিনি তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে উল্লেখ করেন, কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর শুনলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো—পরদিন থেকে কতজন সহকর্মী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলেন। একটি গণমাধ্যম বন্ধ হওয়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান, পরিবার ও ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে।

আকরাম হোসেন বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বড় একটি অংশ এখনো সংবাদপত্রকেন্দ্রিক, বিশেষ করে সরকারি বিজ্ঞাপননির্ভর। একই সঙ্গে দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীও গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করে এই খাতের বিকাশে ভূমিকা রাখছে।

তবে গত কয়েক বছরে দেশে নতুন অনেক সংবাদমাধ্যমের যাত্রা শুরু হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান অল্প সময়ের মধ্যেই সংকটে পড়েছে বা কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন—এই ব্যর্থতার দায় কি শুধু মালিকপক্ষের, নাকি সাংবাদিকতা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে?

নিজের গত ৮–১০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে আকরাম হোসেন বলেন, নতুন গণমাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য বা নির্দিষ্ট স্বার্থ থাকতে পারে। তবে এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব যাঁদের দেওয়া হয়, তাঁদের যোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ববোধও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব ও সঠিক পরিকল্পনার অভাব, কার্যকর টিম গড়ে তুলতে না পারা, দূরদর্শিতার ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করার কারণে শুরুতেই নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন গণমাধ্যম চালুর শুরুতেই বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অভিজ্ঞ কর্মীদের তুলনামূলক বেশি বেতনে নিয়োগের প্রবণতাও কখনো কখনো পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। শুরুতে এটি শক্তিশালী টিম তৈরির উপায় মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা না থাকলে পরবর্তীতে ব্যয় সংকোচন, কর্মী ছাঁটাই বা অন্যান্য সাংগঠনিক সংকট দেখা দিতে পারে।

আকরাম হোসেনের মতে, শুধু ভালো কর্মী দিয়ে একটি গণমাধ্যম দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, সুসংগঠিত টিম, সঠিক বাজেট, স্পষ্ট সম্পাদকীয় লক্ষ্য, দক্ষ নেতৃত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

তিনি বলেন, একটি নতুন গণমাধ্যম শুরু করার আগে অন্তত তিনটি বিষয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন—প্রাথমিক পর্যায়ে কী করা সম্ভব, প্রথম এক বছরে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য কী এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগ কমে গেলে কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হবে।

তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অনেক নতুন গণমাধ্যমের সংকট শুধু অর্থের অভাবে তৈরি হয় না। বরং অর্থ কীভাবে, কোথায় এবং কত সময়ের জন্য ব্যবহার করা হবে—সেই বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনার অভাবও প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

আকরাম হোসেন মনে করেন, একটি টেকসই গণমাধ্যম গড়ে তুলতে বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, বাস্তবভিত্তিক বাজেট এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সমন্বয় জরুরি। এতে একদিকে প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব বাড়বে, অন্যদিকে সংবাদকর্মীদের কর্মসংস্থানও আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল হবে।

 
শেয়ার করুনঃ
Advertisement