১৮৫ দেশে ভ্রমণ করে ইতিহাস গড়লেন নাজমুন নাহার
Published : ০১:২২, ২৬ আগস্ট ২০২৬
প্রথম বাংলাদেশি ও বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের অনন্য মাইলফলক অর্জন করেছেন বাংলাদেশি পরিব্রাজক নাজমুন নাহার। গত ৭ আগস্ট হিমালয়ঘেরা ভুটান সফরের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ১৮৫তম দেশ ভ্রমণ সম্পন্ন করেন।
২৬ বছরের বিশ্বভ্রমণ অভিযাত্রায় নাজমুন নাহার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন। বিশ্বের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, দুর্গম পাহাড়, মরুভূমি, সমুদ্র, মহাসাগর, দ্বীপাঞ্চল এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে ধরেছেন তিনি।
তাঁর এই দীর্ঘ অভিযাত্রার পেছনে রয়েছে নানা প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা। একক ভ্রমণকারী হিসেবে নাজমুন বিশ্বের সব ল্যান্ডলকড বা স্থলবেষ্টিত দেশ সড়কপথে ভ্রমণ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দুর্গম সীমান্ত ও দীর্ঘ স্থলপথ অতিক্রম করতে হয়েছে তাঁকে। নানা ঝুঁকি ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর বিশ্বভ্রমণ থেমে থাকেনি।
২০০০ সালে ভারতে একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের সূচনা হয়। ২০১৮ সালের ১ জুন জিম্বাবুয়ে সফরের মাধ্যমে তিনি ১০০তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক অর্জন করেন। এরপর ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে সফরে ১৫০তম, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভানুয়াতু সফরে ১৭৫তম এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামাস সফরে ১৮৪তম দেশের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।

বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার কাজও করে যাচ্ছেন নাজমুন। তাঁর প্রচারণার অন্যতম বার্তা—“No War, Only Peace, Save the Planet, Stop Child Marriage”। শান্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মতো সামাজিক বিষয়েও তিনি সচেতনতা তৈরি করছেন।
বিশ্বের শতাধিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্জন তুলে ধরেছেন নাজমুন নাহার। আন্তর্জাতিক মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও তিনি তরুণদের সাহস, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস, মানবিক মূল্যবোধ এবং স্বপ্নপূরণের বিষয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন। আন্তর্জাতিক TEDx প্ল্যাটফর্মেও বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।
মানবিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন এই পরিব্রাজক। বিভিন্ন সংগঠনের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যভিত্তিক ২৬টি দাতব্য সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘Safar for Peace’-এর সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। যুদ্ধকবলিত শিশুদের সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণ ও মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে দেশে-বিদেশে ৭০টির বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন নাজমুন নাহার। এর মধ্যে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া Peace Torch Bearer Award উল্লেখযোগ্য।
২০১৮ সালে জাম্বিয়া সরকার তাঁকে ‘Flag Girl’ উপাধিতে সম্মানিত করে। ২০২৩ সালে সেন্ট লুসিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ জোসেফ পিয়েরে তাঁকে ‘Brave Girl’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও তাঁর অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া নাজমুন নাহার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘এশিয়ান স্টাডিজ’ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ‘হিউম্যান Rights and Asia’ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
ভুটান সফর সম্পর্কে নাজমুন নাহার বলেন, “১৮৫তম দেশ ভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চারে ভুটানের পাহাড়ি নৈসর্গিক দৃশ্য আমাকে নতুন করে বিস্মিত করেছে। ভুটান আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারাস ভ্রমণ।” তিনি জানান, পারো, থিম্পু, পুনাখা, ডোচুলা, বুমথাং, ফোবজিখা ও হা ভ্যালিতে তিনি বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন।
১৮৫টি দেশ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে নাজমুন নাহারের অভিযাত্রা এখন বাংলাদেশের নারী সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের এক অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ। লাল-সবুজ পতাকা হাতে তাঁর দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণ আগামী প্রজন্মকে সাহসের সঙ্গে স্বপ্ন দেখার এবং তা বাস্তবায়নের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।


































