‘নাবিল গ্রুপের ফাঁদে’ ইউসিবি

‘নাবিল গ্রুপের ফাঁদে’ ইউসিবি বিজনেস ডেইলি গ্রাফিক্স

নিজস্ব প্রতিবেদক

Published : ২১:২৩, ২৫ আগস্ট ২০২৬

বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে থাকা বেসরকারি খাতের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) নাবিল গ্রুপকে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকার ঋণসুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নথিপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগে অনুমোদিত ৮৪৫ কোটি টাকার ঋণসীমা বাড়িয়ে নতুন করে আরও ১ হাজার ২০ কোটি টাকার সুবিধা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নাবিল গ্রুপকে এই বড় অঙ্কের অর্থায়ন নিয়ে ব্যাংকটির ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ইউসিবি নিজেই বর্তমানে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট মোকাবিলা করছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাংকে নাবিল গ্রুপের নামে ও বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ইউসিবির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৬১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা ছিল শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ। প্রয়োজনীয় প্রভিশন ঘাটতি ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা এবং মূলধন ঘাটতি প্রায় ২ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।

বাড়ছে ঋণসীমা, যুক্ত হচ্ছে নানা সুবিধা
প্রস্তাব অনুযায়ী, নাবিল গ্রুপের বিদ্যমান ৮৪৫ কোটি টাকার অর্থায়ন বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রিভলভিং ক্রেডিট লিমিট ৬৮৫ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

রিভলভিং এলসি সীমা ৫২৫ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২৫ কোটি টাকা, এলটিআর ২৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকা এবং রিভলভিং টাইম লোন ১৮০ কোটি থেকে ৩৫০ কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ১৫০ কোটি টাকার রিভলভিং টাইম লোন-২ এবং ব্যাংক গ্যারান্টি সীমা ২০ কোটি থেকে ৪০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া ১৬০ কোটি টাকার ওভারড্রাফট এবং স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল কেনার জন্য আরও ১৬০ কোটি টাকার নির্দিষ্ট মেয়াদি ঋণ বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

নথিতে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকার সমন্বিত ঋণসীমা নাবিল গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—নাবিল নাবা ফুডস লিমিটেড, নাবিল ফিড মিলস লিমিটেড, নাবিল অটো ফ্লাওয়ার মিল, শিমুল এন্টারপ্রাইজ ও নাবিল এডিবল অয়েল লিমিটেড।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের পুরোনো দায় পরিশোধেও ইউসিবির অর্থ
প্রস্তাবের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো প্রিমিয়ার ব্যাংকে নাবিল গ্রুপের দায় পরিশোধের জন্য ইউসিবির অর্থ ব্যবহারের সুযোগ।

নথি অনুযায়ী, এ উদ্দেশ্যে ৫২০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২২৩ কোটি টাকা এককালীন ব্যাংক গ্যারান্টি এবং ২৯৭ কোটি টাকা এককালীন মেয়াদি ঋণ। ২৯৭ কোটি টাকার ঋণটি সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের জন্য ১৩ শতাংশ সুদে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন ঋণের অর্থ দিয়ে অন্য ব্যাংকের পুরোনো দায় পরিশোধের সুযোগ দিলে প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন অর্থায়ন না হয়ে এক ব্যাংকের ঝুঁকি অন্য ব্যাংকের ওপর স্থানান্তরিত হতে পারে।

জামানত দিতে এক বছর সময়
নাবিল গ্রুপের ক্ষেত্রে ব্যাংকের অনুকূলে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বন্ধকী দলিল ও চার্জ সম্পন্ন করতে ৩৬০ দিন বা এক বছর সময় দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে ইউসিবির ক্রেডিট কমিটি।

বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পাওনা সুরক্ষিত রাখতে শুরুতেই যথাযথ জামানত নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঋণসীমা অনুমোদনের পর দীর্ঘ সময় ধরে জামানত সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়াও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ইউসিবির আর্থিক সংকট
নাবিল গ্রুপকে নতুন অর্থায়নের উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন ইউসিবি নিজেই বড় ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।

২০২৫ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে ব্যাংকটির ৬১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণ ছিল ৯ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংক সংরক্ষণ করতে পেরেছিল ২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। এতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা; অন্যান্য সম্পদ সমন্বয়ের পর মোট ঘাটতি প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।

একই সময়ে ইউসিবির মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা এবং মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) নেমে আসে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশে।

সাবেক ভূমিমন্ত্রীর পরিবারের প্রভাব নিয়ে অভিযোগ
ইউসিবির বর্তমান আর্থিক দুরবস্থার পেছনে ব্যাংকটির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে।

২০২৪ সালে ইউসিবির বর্তমান চেয়ারম্যান শরীফ জহীর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া এক অভিযোগে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটিতে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। ওই সময়ে সাবেক মন্ত্রীর স্ত্রী রুকমিলা জামান ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী নির্বাহী কমিটির দায়িত্বে ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক সাবেক মন্ত্রী, তার পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে।

বিভিন্ন ব্যাংকে নাবিল গ্রুপের বড় ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে নাবিল গ্রুপের নিজস্ব নামে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকে আরও প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বেনামি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে নাবিল গ্রুপের ঋণ নিয়ে এর আগে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের একাধিক মামলা রয়েছে।

এ ছাড়া বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে নাবিল গ্রুপের ব্যবসায়িক ও আর্থিক যোগাযোগ নিয়েও বিভিন্ন তদন্তে তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ঝুঁকি বাড়ছে কার?
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, বড় খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকটে থাকা ইউসিবি কেন এত বড় অঙ্কের নতুন ঋণসুবিধা দিতে যাচ্ছে। বিশেষ করে অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধ, একাধিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সমন্বিত ঋণসীমা এবং জামানত সম্পন্ন করতে এক বছর সময় দেওয়ার মতো সুবিধাগুলো ব্যাংকের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

নাবিল গ্রুপকে এই অর্থায়নের কারণ জানতে ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহীর ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ব্যাংকের চিফ কমিউনিকেশন অফিসার জীশান কিংশুক হকের কাছ থেকেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement