তিন বছরের বিলম্বে ৭ হাজার কোটির স্টিল প্রকল্পে অনিশ্চয়তা
Published : ১৮:২৮, ২৫ আগস্ট ২০২৬
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও নানা আর্থিক ও অবকাঠামোগত জটিলতায় প্রায় তিন বছর পিছিয়ে গেছে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণাধীন বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বিএমএসআইএল) মেগা স্টিল প্রকল্প। প্রায় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় এখন বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে উৎপাদন শুরুর আগেই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১২ দশমিক ৫ লাখ টন স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে প্রকল্পটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। কারখানাটি চালু হলে সরাসরি প্রায় ৭ হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশে প্রথমবারের মতো রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
২০২২ সালে মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। উন্নত প্রযুক্তি, তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয় এবং কম কার্বন নিঃসরণ—এই তিন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটির নকশা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
প্রকল্পের ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য কয়েকটি ব্যাংকের সিন্ডিকেটেড টার্ম লোনের মাধ্যমে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার এলসি খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ২৭৫টি কনটেইনারে দেশে আসে। তবে এলসি ও ব্যাংকিং-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এসব কনটেইনার দীর্ঘ সময় বন্দরে আটকে থাকে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, কনটেইনার দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকায় বন্দর ও শিপিং ড্যামেজ, ডিটেনশন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে ব্যয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এদিকে প্রকল্প শুরুর সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৪ থেকে ৮৬ টাকা। পরবর্তী সময়ে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি করা যন্ত্রপাতির বিপরীতে প্রকল্পের আর্থিক দায়ও বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পটির অর্থায়নে অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে আটটি ব্যাংকের একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়। অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে রয়েছে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও এসবিএসি।
কনসোর্টিয়াম প্রকল্পটির জন্য মোট ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা সিন্ডিকেটেড টার্ম লোন অনুমোদন করে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৭৬ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। বাকি অর্থ ব্যাংকগুলোর কাছে রয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির ঋণের সুদ ও আবগারি শুল্কের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিন্ডিকেটেড ঋণের বিতরণকৃত অংশের ওপর প্রায় ২৪৬ কোটি এবং ফোর্সড লোনের ওপর প্রায় ৬১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
বিএমএসআইএল এ পর্যন্ত প্রায় ৪১১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বলেও জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির স্পন্সর ইকুইটি ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এ অর্থ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বন্দর ও কনটেইনার-সংক্রান্ত ব্যয়, ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য আর্থিক চাপ মিলিয়ে প্রকল্পটির ওপর প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকার অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউটিলিটি অবকাঠামোও একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগের জন্য প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ খাতে দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
এর মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে প্রায় ২৫০ কোটি, গ্যাস সংযোগে ৪০ কোটি এবং পানির লাইনে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানিয়েছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি দৈনিক ৩ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট গ্যাস সরবরাহের অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
প্রকল্পটির প্রাথমিক কমিশনিং ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে কাজ এগোতে পারলে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কারখানাটি উৎপাদনে যেতে পারে।
সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল-এসবিজির চিফ অপারেটিং অফিসার শাহেদ জাহিদ বলেন, উন্নত ও কম-নিঃসরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদনের লক্ষ্যেই প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। কম পরিচালন ব্যয়ে উচ্চমানের স্টিল উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি চালু হলে প্রকৌশলী, দক্ষ পেশাজীবীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং কমিশনিংয়ের সময়ও ২০২৪ সালের শেষ থেকে পিছিয়ে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ নির্ধারিত হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বড় শিল্প প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময়মতো ব্যাংকিং সেবা, এলসি নিষ্পত্তি, বন্দর ব্যবস্থাপনা, ইউটিলিটি সংযোগ এবং স্থিতিশীল নীতিপরিবেশ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে বিলম্ব হলে প্রকল্পের ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায় এবং বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
বিএমএসআইএল চালু হলে দেশের স্টিল খাতে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি রিবার কয়েল ও ওয়্যার রডের আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশীয় শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বড় শিল্প প্রকল্পের বিলম্ব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ, সরকারের রাজস্ব, উৎপাদন এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশও জড়িত। তাই দ্রুত প্রকল্পটির অবশিষ্ট জটিলতা নিরসন করে উৎপাদনে নেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।


































