চিকিৎসক সংকটে ভেঙে পড়ছে বরিশালের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা

চিকিৎসক সংকটে ভেঙে পড়ছে বরিশালের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ছবি: সংগৃহীত

বরিশাল প্রতিনিধি

Published : ০৯:২৩, ১০ আগস্ট ২০২৬

তীব্র চিকিৎসক সংকটে বরিশাল বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিভাগের ছয় জেলার সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত ২ হাজার ৪৩৮টি পদের মধ্যে ১ হাজার ৪৩২টিই শূন্য রয়েছে। ফলে মাত্র ১ হাজার ৬ জন চিকিৎসক দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) বাদে বিভাগের ছয় জেলায় চিকিৎসকের ৬৪ শতাংশ পদই খালি। ১ হাজার ৮৬৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৬৭১ জন চিকিৎসক।

জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি সংকট ভোলায়। সেখানে ৩৮৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে চিকিৎসক কর্মরত আছেন মাত্র ১০৩ জন। বরগুনায় ২১৭টি পদের মধ্যে ৭৪ জন, ঝালকাঠিতে ২০০টির মধ্যে ৫৮ জন, পিরোজপুরে ২৯৫টির মধ্যে ৯২ জন, পটুয়াখালীতে ৩৩৩টির মধ্যে ১২০ জন এবং বরিশাল জেলায় ৪৩৯টি পদের বিপরীতে ২২৪ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নদীবেষ্টিত ও দুর্গম উপজেলাগুলোতে চিকিৎসকদের ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত নিয়োগ ও পদায়ন করা হলেও বিভিন্ন উপায়ে বদলি নিয়ে অনেক চিকিৎসক অন্যত্র চলে যান। কেউ দীর্ঘ ছুটিতে থাকেন, আবার কেউ অন্য কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে কাগজে-কলমে পদ থাকলেও বাস্তবে অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ।

উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় রোগীদের চাপ বাড়ছে বরিশালের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ১ হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এর বাইরে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন আরও ২ হাজারের বেশি মানুষ।

তবে বিপুল রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে শেবাচিমেও চিকিৎসক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। হাসপাতালটির অনুমোদিত ৫৭১টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ২৪০টিই শূন্য। এর মধ্যে ২৪৮টি বিশেষজ্ঞ পদের ১৪৬টি এবং ৩২৩টি সাধারণ চিকিৎসক পদের ৯৪টি শূন্য রয়েছে। ফলে কর্মরত চিকিৎসকদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী আসেন, সেই তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। তারপরও বিদ্যমান জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বরিশাল নগর সম্পাদক মো. রফিকুল আলম বলেন, বরিশালের চিকিৎসক সংকট শুধু জনবলস্বল্পতার কারণে তৈরি হয়নি। এর পেছনে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসকদের ধরে রাখতে ব্যর্থতা এবং কার্যকর তদারকির দুর্বলতাও দায়ী।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিশ্চিত করা না হওয়ায় সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য সরাসরি বিভাগীয় হাসপাতালে চলে আসছেন। ফলে উপজেলা পর্যায়েই যে রোগের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, সেসব রোগীর চাপও এখন বিভাগীয় হাসপাতালের ওপর পড়ছে।

রফিকুল আলম আরও বলেন, দুর্গম উপজেলায় কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ আবাসন, দ্রুত পদোন্নতি এবং কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ব্যবস্থা কার্যকর করা না গেলে দক্ষিণাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা সংকট আরও তীব্র হবে এবং এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ মানুষ।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। পাশাপাশি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরও প্রায় ৫০ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। নতুন নিয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসক সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও নার্সদের উপস্থিতির কারণে কিছুটা সেবা কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে। বিভাগে ২ হাজার ৯১০টি অনুমোদিত সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের বিপরীতে বর্তমানে ২ হাজার ৭৪৫ জন কর্মরত রয়েছেন।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement