আশ্বাস মিলেছে বারবার, তবুও চালু হয়নি শতকোটির হাসপাতাল

আশ্বাস মিলেছে বারবার, তবুও চালু হয়নি শতকোটির হাসপাতাল সিলেটের ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

সিলেট প্রতিনিধি

Published : ১২:৩৩, ২৬ আগস্ট ২০২৬

ভবন আছে, শয্যা আছে, অপারেশন থিয়েটার আছে, আইসিইউ-সিসিইউও প্রস্তুত। নেই শুধু রোগী ও চিকিৎসাসেবা। শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিলেটের ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল ভবন নির্মাণের তিন বছর পরও পুরোপুরি চালু হয়নি। অপরিকল্পিত নির্মাণ, সমন্বয়হীনতা, জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতিসহ নানা জটিলতায় আটকে আছে হাসপাতালটির কার্যক্রম।

মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হয়েছে। তবে জনবল কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়া, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাব না কেনা এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার জটিলতায় কবে নাগাদ হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

শুরু থেকেই বিতর্ক
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সিলেট নগরের চৌহাট্টায় ৬ দশমিক ৯৮ একর জায়গায় হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মূল নির্মাণকাজ শুরু করে। ২০২৩ সালের জুনে ভবন নির্মাণ শেষ হয়।

তবে হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকেই বিতর্ক ছিল। প্রকল্পের জন্য চৌহাট্টার ঐতিহাসিক আবু সিনা ছাত্রাবাসের ভবন ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হলে নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন সংগঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানান। প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো স্থাপনাটি সংরক্ষণ করে সেখানে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবিও ওঠে। শেষ পর্যন্ত ভবনটি ভেঙেই হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়।

স্থানীয় ইতিহাসবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিক এই ভবনে একসময় প্রেস ও সংবাদপত্র ছাপা হতো। ব্রিটিশ আমলে সেখানে হাসপাতালও পরিচালিত হয়েছে। পরে সিলেটের প্রথম মেডিকেল কলেজ এবং আবু সিনা ছাত্রাবাস হিসেবে ভবনটি ব্যবহৃত হয়। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁসহ অনেক গুণী ব্যক্তিরও সেখানে আগমন ঘটেছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।

কর্তৃপক্ষ ছাড়াই নির্মাণ
হাসপাতাল নির্মাণের দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দেওয়া হলেও শুরুতে পরিচালনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা কমিটি নির্ধারণ করা হয়নি। এমনকি নির্মাণ শেষে ভবনটি কার কাছে হস্তান্তর করা হবে, সেটিও স্পষ্ট ছিল না।

এ কারণে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে গণপূর্ত অধিদপ্তর বিষয়টি জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি দেয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক বিভাগীয় পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার সময় গণপূর্ত বিভাগ তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে গিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত বলেন, হাসপাতালের স্থাপত্য নকশা, কর্মপরিকল্পনা এবং বিভিন্ন সেবার জন্য কক্ষগুলোর বিন্যাসসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়নি। নির্মাণের ক্ষেত্রেও তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি।

অনুমোদন মিললেও কাটেনি জটিলতা
চলতি বছরের জুনে হাসপাতাল পরিচালনার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যায়। এরপর সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এর আগে গত ২০ এপ্রিল বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর হাসপাতালটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত চালুর আশ্বাস দেন। ৩১ মে সিলেটের এক অনুষ্ঠানে তিনি হাসপাতালটি শিগগিরই পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর কথা জানান।

তবে এখনো হাসপাতাল পরিচালনার প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো চূড়ান্ত হয়নি। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাবও কেনা হয়নি। আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চূড়ান্ত করার কাজ বাকি রয়েছে।

গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু জাফর বলেন, ভবন হস্তান্তরের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত। তবে সীমানাপ্রাচীর, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও ফার্নিচার কেনার কাজ এখনো বাকি। এসব কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগার কথা নয়, তবে প্রক্রিয়াগত কারণে নির্দিষ্ট সময় বলা কঠিন।

ভবনে আছে আইসিইউ-সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার
হাসপাতালের ১৫ তলা ভবনের মধ্যে আটতলা নির্মাণ করা হয়েছে। রং, বৈদ্যুতিক সংযোগ, টাইলস, কাচ, দরজা-জানালা ও লিফটের কাজ শেষ হয়েছে।

ভবনের প্রথম তলায় টিকিট কাউন্টার ও অপেক্ষাকক্ষ, দ্বিতীয় তলায় বহির্বিভাগ, রিপোর্ট বিতরণ ও পরামর্শক কক্ষ এবং তৃতীয় তলায় রোগনির্ণয় বিভাগ রাখা হয়েছে। চতুর্থ তলায় রয়েছে কার্ডিয়াক ও জেনারেল অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও সিসিইউ। পঞ্চম তলায় স্ত্রীরোগ, চক্ষু, অর্থোপেডিকস এবং নাক-কান-গলা বিভাগ রাখা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম তলায় রয়েছে ওয়ার্ড ও কেবিন।

হাসপাতালটিতে ১৯টি আইসিইউ শয্যা, ৯টি সিসিইউ শয্যা এবং ৪০টি কেবিন রয়েছে।

আপাতত বহির্বিভাগ চালুর পরিকল্পনা
সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. জিয়াউর রহমান বলেন, হাসপাতালের দায়িত্ব পাওয়ার পর সিন্ডিকেটের সভায় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি হাসপাতাল চালুর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে এবং ইতিমধ্যে একাধিক সভা করেছে।

তিনি বলেন, আপাতত বহির্বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল চাওয়া হচ্ছে। প্রথমে বহির্বিভাগ, এরপর ধাপে ধাপে ডায়াগনসিস ও ইনডোর বিভাগ চালু করে হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা চলছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়া নির্মিত ভবনটি শেষ পর্যন্ত সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে চালুর অনুমোদন পেয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করে দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা গেলে সিলেটের স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

কমবে ওসমানী হাসপাতালের চাপ?
সিলেটের অন্যতম প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ১৯৯৮ সালে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ৫০০ থেকে ৯০০-তে উন্নীত করা হলেও রোগীর চাপ এখনো অনেক বেশি। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে হয়।

চৌহাট্টায় নির্মিত ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালটি চালু হলে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে ভবন নির্মাণের তিন বছর পরও জনবল, সরঞ্জাম, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। ফলে শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দিতে পারবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement