জোর করে নেওয়া শিক্ষকের পদত্যাগপত্রের বৈধতা নেই: হাইকোর্ট
Published : ১২:৫৭, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জোরপূর্বক কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনগত বৈধতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এমন পদত্যাগে স্বাক্ষর নেওয়া শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও সতর্কতা দিয়েছেন আদালত।
‘মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন।
সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইকবাল কবির রায়টি লিখেছেন। রিটকারীর পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম।
রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি। তার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। ফলে এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বা চাপ প্রয়োগ করে নেওয়া পদত্যাগকে বৈধতা দেয় না।
মামলার নথি অনুযায়ী, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল ব্যক্তি তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার পরদিন তিনি কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
এরপর ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান তিনি। পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছেও আবেদন করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা ও হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে পুনরায় প্রধান শিক্ষক পদে বহাল করার নির্দেশ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তবে ওই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে একই বছর হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট রুলটি নিষ্পত্তি করে রায় ঘোষণা করেন আদালত।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, বাস্তবে রিটকারীর পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা ছিল না। এমনকি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি এমপিওর অংশ হিসেবে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ আইনগতভাবে তাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে এবং চাকরিতে বহাল রাখতে বাধ্য। তাই তিনি অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের অধিকারী।
আদালত আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে শিক্ষা বোর্ডের ম্যানেজিং কমিটির প্রস্তাবিত শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন কিংবা বাতিল করার ক্ষমতা রয়েছে। প্রয়োজন হলে বোর্ড ব্যবস্থা নেওয়ারও ক্ষমতা রাখে। ফলে বোর্ডের দেওয়া নির্দেশনা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচারের নীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং সমতার বিধানের পরিপন্থী। একই সঙ্গে বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলেও উল্লেখ করেন আদালত।
রায়ে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে পুনর্বহালের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
আদালতের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি বাতিল, কমিটির সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক—যিনি ম্যানেজিং কমিটির সদস্য-সচিব—তার এমপিও বন্ধের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই রায় জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


































