সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ, গুজব-অপতথ্য ও অনলাইন হয়রানিতে কঠোর শাস্তির প্রস্তাব
Published : ১৬:২৭, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাইবার অপরাধের ধরন ও পরিধি পরিবর্তনের সঙ্গে আইনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব ও অপতথ্য প্রচার, ডিজিটাল মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন করা, বুলিং, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, সেক্সটর্শন, রিভেঞ্জ পর্ন ও এআই-নির্মিত ক্ষতিকর কনটেন্টের মতো বিষয়ে নতুন বিধান ও শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের গঠিত একটি মন্ত্রিসভা কমিটি ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা করছে। জুলাইয়ে গঠিত কমিটির বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে আইনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। খসড়াকে আরও হালনাগাদ, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত করতে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে।
সরকার একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিচ্ছে। সেপ্টেম্বরে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও একাধিক আলোচনা হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর সরকার প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে সম্পাদক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
গুজব ও অপতথ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সাজা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে নতুন ২৬/ক ধারা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এতে সাইবার স্পেসে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ ও প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়ায় গুজব বলতে এমন অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার ঝুঁকি তৈরি করে।
ডিজিটাল মানহানি ও এআই কনটেন্ট
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল মানহানির ক্ষেত্রেও নতুন বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তথ্য, অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস কিংবা এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্ট প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, সেক্সটর্শন, ডিজিটাল শিশু নিপীড়ন, রিভেঞ্জ পর্ন, অশ্লীল কনটেন্ট প্রকাশ এবং বুলিংয়ের মতো অপরাধকেও শাস্তির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার প্রস্তাব
সাইবার স্পেসে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের বিষয়টিও সংশোধনীতে গুরুত্ব পেয়েছে। এর আগে সংসদে পাস হওয়া সংশোধনীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে এআই-নির্মিত ক্ষতিকর, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কনটেন্ট অপসারণের ব্যবস্থা জোরদারের কথাও সরকার জানিয়েছে।
সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, এআই-নির্মিত বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এবং অনলাইন হয়রানি মোকাবিলাই সংশোধন উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
তবে প্রস্তাবিত কিছু বিধান নিয়ে সাংবাদিক, আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। তাদের মতে, ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘হেয় প্রতিপন্ন’ ও ‘মানহানি’র মতো অপরাধের সংজ্ঞা ও প্রয়োগের পরিধি বিস্তৃত হলে তা বৈধ মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও খসড়ার কয়েকটি বিধান নিয়ে মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ঝুঁকির কথা জানিয়েছে এবং অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাপক পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে সরকার বলছে, আইনটির উদ্দেশ্য সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকে দমন করা নয়। ২৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রস্তাবিত আইনকে নিপীড়নমূলক হতে দেওয়া হবে না এবং এর অপব্যবহার থেকে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীও এর আগে জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে মুক্তচিন্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমন করার কোনো উদ্দেশ্য সরকারের নেই।
অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হবে খসড়া
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ডিজিটাল ও এআই-নির্ভর সহিংসতা মোকাবিলায় কার্যকর আইনি কাঠামো প্রয়োজন এবং আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করা হচ্ছে।
২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানও বলেন, শুধু আইনি ব্যবস্থা দিয়ে অপতথ্য পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়; এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা প্রয়োজন।
ফলে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে একদিকে সাইবার অপরাধ, অনলাইন হয়রানি ও ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলার বিধান জোরদার করা এবং অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে সংশোধনীটি চূড়ান্ত আইন নয়। বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত পর্যালোচনার পর খসড়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই প্রস্তাবিত শাস্তি ও ক্ষমতাগুলোকে খসড়া প্রস্তাব হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।


































