‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত চান শ্রমিক নেতারা

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত চান শ্রমিক নেতারা

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৯:২৪, ১৬ আগস্ট ২০২৬

বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাতে পূর্ণ আস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসচিব ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (জেওসিএল) লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব।
তিনি বলেছেন, দেশের স্বার্থ, জনগণের কল্যাণ এবং শ্রমিকদের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল আমদানিতে শ্রমিকদের কোনো আপত্তি নেই। তাদের প্রত্যাশা, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সোমবার দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (জেওসিএল) কার্যালয় ‘যমুনা ভবন’-এর সামনে জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানি বন্ধ ও বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি। কর্মসূচিতে জেওসিএলসহ জ্বালানি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীরা অংশ নেন।

মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, দেশে এরই মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হচ্ছে। এখন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন—সবার আগে বাংলাদেশ। আমরাও বলতে চাই, সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা আশা করি, দেশের স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তাঁর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।”

তবে জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই শ্রমিক নেতা। তার অভিযোগ, সরকারের ভেতরে থাকা একটি মহল শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

মুহাম্মদ এয়াকুবের দাবি, বিভিন্ন ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিদ্যমান ২২টি সুনির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা সময়োপযোগী করার বিষয়েও গড়িমসি করা হচ্ছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জ্বালানি খাতের শ্রম আইন শ্রমিকবান্ধব রাখার পরিবর্তে শ্রমিকবিরোধী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তার ভাষ্য, সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বললেও জ্বালানি খাতে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আওতাধীন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, এসএওসিএল ও এলপিজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বিদ্যমান সুবিধা বাড়ানোর পরিবর্তে কমানোর চেষ্টা চলছে।

শ্রমিক নেতারা জানান, প্রতি দুই বছর পর পর দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে বিপিসির তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সময়োপযোগী করা হয়। তবে সর্বশেষ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ১৯ মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন চুক্তি সম্পাদিত হয়নি।

তাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অবহেলা ও গড়িমসির কারণেই নতুন চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ ছাড়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ১৭ জুন বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোর জন্য ‘প্রান্তিক সুবিধা নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলে দাবি করেন শ্রমিক নেতারা। তাদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিদ্যমান ২২টি সুযোগ-সুবিধা কাটছাঁট করা হতে পারে।

শ্রম আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি
শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর সংশোধিত আইনের ২(৬২) ধারায় সংজ্ঞায়িত ‘শিল্প বিরোধ এবং শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ সংক্রান্ত ২০৯, ২১০ ও ২১১ ধারা রহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তাদের মতে, এসব ধারা বাতিল হলে শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা সিবিএ নেতাদের কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে, গত ২৬ জুলাই খনিজ সম্পদ বিভাগের এক অফিস আদেশে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন)কে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলোতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সুপারিশ চাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানান নেতারা।

জ্বালানি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের অধীনে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ ভিত্তিতে কম বেতনে কাজ করা শ্রমিকদেরও বিষয়টি তুলে ধরেন শ্রমিক নেতারা।

তাদের দাবি, নতুন লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এসব শ্রমিককে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না। ফলে অভিজ্ঞ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, শ্রমিক-কর্মচারীরা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা চাইছেন না; তারা শুধু ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা চান। জ্বালানি খাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়রানি বন্ধ, শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণ এবং অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।

“আমরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে চাই, জ্বালানি খাতে কাউকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা চাইছেন না; তারা শুধু তাদের ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা চান,” বলেন তিনি।

যমুনা অয়েল কোম্পানি লেবার ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হোসেনের সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন পদ্মা অয়েল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি জসিম উদ্দিন, এলপিজি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মনির হোসেন, বিপিসি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম, পদ্মা অয়েল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক সেলিম কবির চৌধুরী এবং যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সহসাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ মন্নানসহ অন্যরা।

বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফেডারেশন জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের শীর্ষ সংগঠন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, যমুনা অয়েল কোম্পানি, ইস্টার্ন রিফাইনারি, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি এবং এলপি গ্যাস লিমিটেডের সিবিএ সংগঠনগুলোকে নিয়ে এ ফেডারেশন গঠিত।

 

এমডিএইচ

শেয়ার করুনঃ
Advertisement