ছেলেকে চিকিৎসক, মেয়েকে নার্স বানিয়ে ৫৪ বছরে এসএসসি পাস বাবা
Published : ১৭:৫২, ১১ আগস্ট ২০২৬
পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল সেই ১৯৮৩ সালে। এরপর সংসার, ক্ষুদ্র ব্যবসা, চাকরি আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার ব্যস্ততায় কেটে গেছে চার দশকের বেশি সময়। কিন্তু পড়াশোনার স্বপ্নটা হারিয়ে যায়নি। শেষ পর্যন্ত ৫৪ বছর বয়সে সেই স্বপ্ন পূরণ করলেন নাটোরের আলী আকবর।
ছেলেকে চিকিৎসক ও মেয়েকে নার্স বানানোর পর আবারও পড়াশোনায় ফিরেছিলেন তিনি। রাজশাহীর নওহাটা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি উচ্চবিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার বিল্ডিং মেইনটেন্যান্স ট্রেড থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪ দশমিক ৩৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন আলী আকবর।
তাঁর এই সাফল্যে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আনন্দিত প্রতিবেশীরাও।
পেশায় বেসরকারি হাসপাতালের কর্মী আলী আকবরের বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া পৌর সদরে। নিজের সাফল্য সম্পর্কে তিনি বলেন, পড়ালেখার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায় থাকলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব—নিজের জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি সেটিই প্রমাণ করতে চেয়েছেন।
ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের সংসারে দ্বিতীয় সন্তান আলী আকবর। বাবার সীমিত আয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল। তবু গ্রামের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করেছিলেন তিনি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ১৯৮৩ সালে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাবাকে সহযোগিতা করতে ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হন। ১৯৯০ সালে বিয়ে করেন।
এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্মের পর পরিবার নিয়ে রাজশাহীতে চলে যান আলী আকবর। সেখানে তিনি ও তাঁর স্ত্রী একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি নেন। সীমিত আয়ে সংসারের খরচের পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা কঠিন হলেও তাঁদের শিক্ষার ব্যাপারে কোনো আপস করেননি তিনি।
২০১৫ সালে মেয়েকে নার্সিং পড়ান। অন্যদিকে ছেলেকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করেন। ২০১৯ সালে এমবিবিএস পাস করে ছেলে ইসমাইল হোসেন ৪২তম বিসিএসে চিকিৎসক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন।
ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর নিজের অসম্পূর্ণ পড়াশোনার স্বপ্ন আবার জেগে ওঠে আলী আকবরের মনে। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করলে স্ত্রী ও সন্তানরা তাঁকে উৎসাহ দেন। পরে স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন তাঁরাই।
আলী আকবর বলেন, ‘আজকাল অনেক ছেলেমেয়ে দিনরাত মোবাইল দেখে সময় নষ্ট করে। পরীক্ষা দিয়ে ফেল করে। আমি তাদের দেখাতে চেয়েছি—ইচ্ছাশক্তি ও মনোবল থাকলে সাফল্য আসবেই।’
সন্তানদের পড়াশোনায় মনোযোগী রাখতে মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি কঠোর ছিলেন। তাঁর ছেলে মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষে ওঠার পর মোবাইল পেয়েছেন। আর মেয়ে নার্সিং পাস করার পর মোবাইল হাতে নিয়েছেন।
ছেলে চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন বলেন, বাবা পারিবারিক আলোচনায় আবার পড়াশোনা শুরু করার কথা বলতেন। তাঁরা তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং স্কুলে ভর্তিসহ পড়াশোনার বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেছেন।
বাবার এসএসসি পাসের খবরে তাঁরা ভীষণ খুশি জানিয়ে ইসমাইল বলেন, ‘আমরা চাই, বাবা আরও পড়ালেখা করুন।’
আলী আকবরের এই সাফল্য যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—শেখার কোনো বয়স নেই। স্বপ্ন পূরণের পথে বয়স নয়, ইচ্ছাশক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি।


































