আতিকা আফসানার এগিয়ে চলার গল্প
Published : ০০:৩১, ৯ আগস্ট ২০২৬
ফের আলোচনায় মডেল ও অভিনেত্রী আতিকা আফসানা। ২০২০ সালে ফটোশুটের মাধ্যমে শোবিজে পথচলা শুরু তার। এরপর নাটক ও ধারাবাহিকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। দীর্ঘ এই পথচলায় ক্যামেরার সামনে নানা চরিত্রে হাজির হয়েছেন তিনি। তবে ক্যারিয়ারের মাঝপথে নিজেকে আরও পরিপাটি করে গড়ে তোলা, পড়াশোনা এবং ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সময় দিতে প্রায় দেড় বছর মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন আতিকা।
সেই বিরতি শেষে আবারও নিয়মিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে এবার তার লক্ষ্য শুধু কাজের সংখ্যা বাড়ানো নয়; ভালো গল্প ও অর্থবহ চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া। অভিনয়ের পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এই অভিনেত্রীর স্বপ্ন, ভবিষ্যতে একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
শুরুর দিনগুলোর গল্প
শোবিজে শুরুর দিনের স্মৃতিচারণ করে আতিকা আফসানা বলেন, সেই সময়টা ছিল রোমাঞ্চ ও কৌতূহলে ভরা। আয়নার সামনে পোজ দেওয়া, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কিংবা প্রথমবার নিজেকে পেশাদার ফ্রেমে দেখা—প্রতিটি অভিজ্ঞতাই ছিল তার কাছে নতুন।
প্রতিটি শুটিং থেকেই নতুন কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তার মতে, শুরুর সেই অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তী সময়ে নিজেকে গড়ে তোলার ভিত তৈরি করেছে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী—এমন প্রশ্নে আতিকা গুরুত্ব দেন ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসকে। তার ভাষায়, শোবিজে চড়াই-উতরাই থাকবেই। কখনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, আবার কখনো নিজের কাজ নিয়েও নানা ধরনের মন্তব্য শুনতে হয়। এসবের মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে কাজ করে যাওয়াকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি।
চরিত্রের গভীরে যেতে চান
নাটক ও ধারাবাহিকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েও সন্তুষ্ট আতিকা। তার কাছে প্রতিটি চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেসব চরিত্রে মানুষের আবেগ, সংগ্রাম কিংবা মনের জটিল দিকগুলো তুলে ধরার সুযোগ থাকে, সেসব চরিত্রে অভিনয় করেই বেশি তৃপ্তি পান তিনি।
দর্শক যখন কোনো চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পান, সেটিকেই অভিনয়জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি মনে করেন এই অভিনেত্রী।
কেন দেড় বছরের বিরতি?
ক্যারিয়ারের মাঝপথে প্রায় দেড় বছরের বিরতির পেছনে ছিল ব্যক্তিগত ও একাডেমিক কিছু কারণ। আইন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবার ও নিজের মানসিক শান্তিকেও সময় দিতে চেয়েছিলেন আতিকা। একটা সময় তার মনে হয়েছে, নিজেকে আরও উন্নত করা এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য মিডিয়া থেকে কিছুটা দূরে থাকা প্রয়োজন।
তবে বিরতির সময়টিও নিজের জন্য কাজে লাগিয়েছেন তিনি। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করার চেষ্টা করেছেন। মানুষের আচরণ ও আবেগ কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। একজন অভিনেত্রী হিসেবে এসব অভিজ্ঞতা তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি ফিটনেস ও নিজের দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিয়েছেন।
এবার মানসম্মত কাজের লক্ষ্য
কাজে ফেরার পর নতুন করে বেশ কিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন আতিকা। কাজের সংখ্যা নয়, মানকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। গল্পের গভীরতা, চরিত্রের গুরুত্ব এবং সেই কাজ দর্শকের মনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে—এসব বিষয় বিবেচনা করেই কাজ বেছে নিতে চান।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, এমন চরিত্রের প্রতিই তার আগ্রহ বেশি।
মাধ্যমের ক্ষেত্রে সিনেমা ও ওটিটির প্রতি আলাদা আগ্রহ রয়েছে তার। আতিকা মনে করেন, এসব মাধ্যমে চরিত্রের গভীরে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। গল্প বলার পরিসরও বিস্তৃত। তাই ভবিষ্যতে সিনেমা কিংবা ওটিটিতে শক্তিশালী ও ভিন্নধর্মী চরিত্রে কাজ করতে চান তিনি।
ঐতিহাসিক কিংবা জীবনীভিত্তিক কোনো শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছা দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি নারীকেন্দ্রিক থ্রিলার কিংবা তীব্র আবেগের কোনো গল্পে জটিল মানসিকতার চরিত্র রূপায়নের স্বপ্নও রয়েছে তার। এমন কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে চান, যা কাজ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন দর্শকের মনে থেকে যাবে।
কঠিন অভিজ্ঞতা দিয়েছে শিক্ষা
শোবিজে কাজ করতে গিয়ে কিছু কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখিও হয়েছেন আতিকা। তবে সেসব অভিজ্ঞতাকে নিজের জন্য শিক্ষার জায়গা হিসেবে দেখেন তিনি।
আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী হয়েছেন বলে জানান এই অভিনেত্রী। অন্ধভাবে সবাইকে বিশ্বাস না করে নিজের কাজ ও লক্ষ্যের প্রতি মনোযোগী থাকার শিক্ষা পেয়েছেন। কঠিন অভিজ্ঞতাগুলো তাকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করেছে বলেও মনে করেন তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন
অভিনয়ের পাশাপাশি আইনজীবী হওয়ার স্বপ্নের পেছনেও রয়েছে দীর্ঘদিনের আগ্রহ। ছোটবেলা থেকেই ন্যায়বিচার ও নিয়মের প্রতি তার এক ধরনের আকর্ষণ ছিল। তার বিশ্বাস, আইনের সঠিক প্রয়োগ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে ধরে রাখার ইচ্ছা থেকেই আইন পেশার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আতিকা মনে করেন, অভিনয় ও আইন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগত হলেও দুটিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অভিনয় তার আবেগের জায়গা, অন্যদিকে আইন তার যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্র। তাই ভবিষ্যতে দুটো পথকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে চান তিনি।
সময় ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে পড়াশোনা, আইন পেশা এবং অভিনয়—তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
মায়ের অনুপ্রেরণা
নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে মায়ের কথা বলেন আতিকা। মায়ের ধৈর্য, শক্তি ও নিঃশর্ত সমর্থন তাকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
জীবনের কঠিন সময়ে মায়ের পাশে থাকা তাকে কখনো হাল না ছাড়ার শিক্ষা দিয়েছে বলে জানান তিনি।
পর্দার আতিকা, বাস্তবের আতিকা
ক্যামেরার সামনে এবং ব্যক্তিজীবনের আতিকা আফসানার মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। পর্দায় চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে নানা রূপে উপস্থাপন করলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি বেশ সাধারণ থাকতে পছন্দ করেন।
পরিবারকে সময় দেওয়া, নিজের মতো করে থাকা এবং মানসিক শান্তিকে গুরুত্ব দেওয়াই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
নতুন প্রজন্মের যারা অভিনয়ে আসতে চান, তাদের জন্যও রয়েছে আতিকার পরামর্শ। তার মতে, শুধু গ্ল্যামারের পেছনে ছুটলে হবে না; অভিনয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। ধৈর্য ধরে নিয়মিত চর্চা করতে হবে।
তার ভাষায়, রাতারাতি তারকা হওয়া সম্ভব হলেও একজন ভালো শিল্পী হয়ে উঠতে দীর্ঘ সময়ের সাধনা প্রয়োজন। তাই পড়াশোনা ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার পরামর্শ দেন তিনি।
নতুন কাজের প্রস্তুতি
বিরতির পর নতুন কিছু কাজ নিয়েও এগোচ্ছেন আতিকা। কয়েকটি প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা চলছে। খুব শিগগিরই নতুন কিছু কাজের মাধ্যমে দর্শকের সামনে হাজির হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
এবার আগের চেয়ে আরও পরিণত ও ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করতে চান এই অভিনেত্রী।
দশ বছর পর কোথায় দেখতে চান নিজেকে?
দশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান—এমন প্রশ্নে আতিকার স্বপ্নটা আরও বিস্তৃত। একদিকে সফল ও মননশীল অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে চান তিনি, অন্যদিকে একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবেও সমাজের জন্য কাজ করতে চান।
তার কাছে এই দুই পরিচয় একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক।
অভিনয় তার শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখবে, আর আইন তাকে যুক্তি ও ন্যায়বোধের জায়গা থেকে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ দেবে। তাই নতুন করে পথচলা শুরু করা আতিকা আফসানার সামনে এখন লক্ষ্য একটাই—নিজের দুই স্বপ্নকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া এবং ভালো কাজের মাধ্যমে দর্শকের মনে একটি স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া।
































