বিরোধের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থ: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
Published : ০০:২৫, ১৯ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ভৌগোলিক বাস্তবতা, ইতিহাস, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার পথ খোলা রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইস্যুকে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের একমাত্র নির্ধারক না করে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সম্পর্ক পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, সড়ক-রেল-নৌ যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক যোগাযোগ। ফলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধানে সংলাপ জরুরি
দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন। গঙ্গা পানি চুক্তির পাশাপাশি তিস্তার পানি বণ্টনসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন। একইভাবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্য, পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সহযোগিতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়গুলোও নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া দরকার।
বাংলাদেশের জন্য ভারতের বিশাল বাজার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ সহযোগিতার মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে উভয় দেশের অর্থনীতিই লাভবান হতে পারে।
উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের প্রয়োজন
দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চপর্যায়ের সফর, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে কঠিন বিষয়গুলো নিয়েও সরাসরি আলোচনা করা সম্ভব।
কোনো একটি বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা কূটনৈতিকভাবে কার্যকর পন্থা হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়; বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনার মাধ্যমে অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করাই বাস্তবসম্মত কূটনীতি।
অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থ
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অংশীদার দুই দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ। সীমান্ত বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, পর্যটন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন ও বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে লাখো মানুষের স্বার্থ জড়িত।
দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন অর্থনৈতিক ও জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ককে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আত্মবিশ্বাসী কূটনীতিই হতে পারে বাংলাদেশের পথ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করা প্রয়োজন। এর অর্থ অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নয়, আবার অপ্রয়োজনীয় বিরোধও নয়।
বাংলাদেশ তার স্বার্থের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে এবং প্রয়োজন হলে কঠিন অবস্থানও নিতে পারে। একই সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রেখে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের কূটনীতিতে বন্ধুত্ব যেমন থাকে, তেমনি থাকে নিজের স্বার্থ রক্ষার দৃঢ়তা। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে—পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করা।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ ও ভারত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দুই দেশের মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় অর্থনীতি নয়, পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে।
দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস ও উত্তেজনা আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে দুর্বল করতে পারে। বিপরীতে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা বাড়ানো হলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোনো একক ব্যক্তি, দল বা সরকারের চেয়ে অনেক বড়। রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে, সরকারের পরিবর্তন হবে, বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যও থাকবে। কিন্তু দুই দেশের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা স্থায়ী।
তাই বিরোধকে সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু না বানিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখাই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল।
কূটনীতির মূল লক্ষ্য সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও নিজের স্বার্থ রক্ষা করে সহযোগিতা ও সমাধানের পথ তৈরি করা। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎও সেই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই নির্ভর করছে।
এমডিএইচ
































