জাহাজে ত্রুটি-দুর্ঘটনা ও ক্লান্ত নাবিক: চাপে মার্কিন নৌবাহিনী

জাহাজে ত্রুটি-দুর্ঘটনা ও ক্লান্ত নাবিক: চাপে মার্কিন নৌবাহিনী ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Published : ১৮:৫০, ১৮ আগস্ট ২০২৬

জাহাজ নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা, যন্ত্রপাতির ত্রুটি, দুর্ঘটনা, রক্ষণাবেক্ষণ সংকট এবং দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন—সব মিলিয়ে নানা চাপে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। একের পর এক ঘটনায় মার্কিন নৌবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা, নাবিকদের কর্মপরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম দেশটির নৌবাহিনী। বিমানবাহী রণতরী, ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার ও অন্যান্য যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই বিশাল বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন ও রক্ষণাবেক্ষণের চাপ কতটা কার্যকরভাবে সামলাতে পারছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

ইউএসএস বেনফোল্ডে চার দিন বিদ্যুৎহীন

২০২৬ সালের ২৪ জুলাই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সময় আর্লে বার্ক-শ্রেণির গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস বেনফোল্ডে বড় ধরনের প্রকৌশলগত ত্রুটি দেখা দেয়। দক্ষিণ চীন সাগরে জাহাজটি টানা চার দিন বিদ্যুৎহীন ছিল।

মার্কিন সপ্তম বহরের মুখপাত্র কমান্ডার ম্যাথিউ কোমারের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজটির জেনারেটরে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় খাবার প্রস্তুত, শৌচাগার ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক সুবিধা ব্যাহত হয়। পানীয় জলের সরবরাহও সমস্যার মুখে পড়ে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে জর্জ ওয়াশিংটন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ সহায়তায় এগিয়ে আসে। ইউএসএস রবার্ট স্মলস ক্রুদের খাবার সরবরাহ করে। জেনারেটরের ত্রুটির প্রকৃত কারণ তখনও তদন্তাধীন ছিল।

দীর্ঘ মোতায়েনে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন

১৮ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রায় ৫ হাজার নাবিক নিয়ে বিমানবাহী রণতরীটি ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ সময় খাদ্য সরবরাহ, প্লাম্বিং, পানির ব্যবস্থা এবং নাবিকদের চরম ক্লান্তি নিয়ে অভিযোগ সামনে আসে। কয়েকজন নাবিক অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার কথা চিন্তা করেছিলেন বা চেষ্টা করেছিলেন—এমন দাবিও উঠে আসে।

তবে এসব দাবি অস্বীকার করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। একজন নৌ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, আত্মহত্যার প্রবণতা বা এ ধরনের প্রচেষ্টা বেড়ে যাওয়ার কোনো তথ্য তাদের নজরে আসেনি। তাঁর দাবি, জাহাজে বিশুদ্ধ পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি কর্মচাপ নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি নতুন নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখার মধ্যে নৌবাহিনীর সদস্যদের ‘গুরুতর মানসিক কষ্টের’ হার সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। দুর্বল জীবনযাত্রার মান, অতিরিক্ত শব্দ এবং ঘুম ও বিশ্রামের সীমিত সুযোগকে বড় চাপের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডে আগুন

২০২৬ সালের মার্চে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড রণতরীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও নৌবাহিনীর ওপর চাপের চিত্র সামনে আনে। জাহাজটির প্রধান লন্ড্রি এলাকায় আগুন লাগার পর তা নিয়ন্ত্রণে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে।

আগুনের কারণে থাকার জায়গা হারান ৬০০-এর বেশি নাবিক। তাদের অনেকে মেঝে ও টেবিলের ওপর রাত কাটাতে বাধ্য হন। ঘটনায় দুজন নাবিক আহত হন এবং আরও অনেকে ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

দীর্ঘ মোতায়েনের পাশাপাশি জাহাজটিতে প্লাম্বিংসহ বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যাও দেখা দিয়েছিল। নির্ধারিত মেরামত ও রিফিট কার্যক্রমও পিছিয়ে যায়।

অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল জন এফ. কারবি সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ সময় মোতায়েনে থাকলে যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি নাবিকরাও ক্লান্ত হয়ে পড়েন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময় কাজ চালিয়ে গেলে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ইউএসএস হ্যারি এস. ট্রুম্যানের সংঘর্ষ

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মিশরের পোর্ট সাঈদের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজ বেসিকটাস-এমের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ইউএসএস হ্যারি এস. ট্রুম্যান। এতে কোনো নাবিক আহত হননি এবং রণতরীতে পানি ঢোকেনি।

তবে তদন্তে বলা হয়, জাহাজটির গতিপথে সামান্য পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারত। সংঘর্ষস্থলের মাত্র কয়েক মিটার দূরেই আটজন নাবিক অবস্থান করছিলেন।

এর বাইরে রেড সিতে বিমানবাহী রণতরী থেকে এফ/এ-১৮এফ সুপার হর্নেট হারানো এবং ঝুঁকি এড়ানোর সময় আরেকটি এফ/এ-১৮ই ও একটি টো ট্র্যাক্টর সাগরে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও মার্কিন নৌবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তদন্তকারীদের মতে, এসব ঘটনায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। চাপযুক্ত কর্মসূচি, দুর্বল যোগাযোগ, সীমিত অপারেশনাল জ্ঞান এবং সমন্বিত প্রশিক্ষণের ঘাটতিও এসব দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

বহরে ঢোকার আগেই জাহাজ নির্মাণে সংকট

সমস্যা শুধু সমুদ্রে থাকা যুদ্ধজাহাজেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের মার্চে মার্কিন সরকারের জবাবদিহিতা কার্যালয় (জিএও) জানায়, জাহাজ নির্মাণে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও গত দুই দশকে মার্কিন নৌবহরের আকার প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি।

লিটোরাল কমব্যাট শিপ ও জুমওয়াল্ট-শ্রেণির কর্মসূচিতে ব্যয় ও সক্ষমতা নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। কনস্টেলেশন-শ্রেণির ফ্রিগেট নির্মাণ কর্মসূচিও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রায় তিন বছর পিছিয়ে রয়েছে।

২০১৫ সাল থেকে জিএও মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণ প্রক্রিয়া উন্নত করতে ৯০টি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সংখ্যায় এগিয়ে যাচ্ছে চীনা নৌবাহিনী

এই পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত নৌবাহিনী।

মার্কিন নৌ গোয়েন্দা দপ্তরের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির বহরে ৩৭০টির বেশি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ১৫৩টি বড় সারফেস কমব্যাটেন্ট।

অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনী গত কয়েক বছর ধরে ৩০০টির কম জাহাজ পরিচালনা করছে। যদিও বহরের আকার ৩৫০টির বেশি করার প্রয়োজনীয়তার কথা বিভিন্ন পর্যায়ে বলা হয়েছে।

চীন দ্রুতগতিতে নতুন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করছে। প্রায় প্রতি চার মাসে একটি করে নতুন ফ্রিগেট বা বড় সারফেস কমব্যাটেন্ট যুক্ত করার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে একদিকে মার্কিন নৌবাহিনীকে পুরোনো যুদ্ধজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, নাবিকদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মচাপ ও দুর্ঘটনা সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে চীন দ্রুত নতুন যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করছে। সব মিলিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নৌশক্তির আধিপত্য কতটা টেকসই থাকবে, তা নিয়ে কৌশলগত মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement