ইয়েমেন সংঘাত: হুতিবিরোধী বাহিনীকে অর্থ দেবে আমিরাত, আকাশপথে সহায়তায় সৌদি আরব
Published : ১১:৫৫, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি সরকারি বাহিনীকে আবারও অর্থায়ন করতে সম্মত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এর বিনিময়ে হুতিবিরোধী বাহিনীকে আকাশপথে সহায়তা দিতে রাজি হয়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন এই সমঝোতাকে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের মতবিরোধ কমে আসার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশ দুটির মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রা নিয়ে উভয় পক্ষের উদ্বেগ বাড়ছে।
হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলার কারণে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ ইয়েমেনের বাহিনীকে আবার অর্থায়নের উদ্যোগ
দক্ষিণ ইয়েমেনের বাহিনীগুলোর মধ্যে জায়ান্ট ব্রিগেডস অন্যতম। অতীতে এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করত সংযুক্ত আরব আমিরাত। হুতিবিরোধী সামরিক জোটের কার্যকর বাহিনীগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এই গোষ্ঠী। তবে গত জানুয়ারিতে ইয়েমেনে সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর সিদ্ধান্তের পর তাদের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় ইউএই।
এদিকে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গত সপ্তাহে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এ বিষয়ে এখনো সাড়া দেয়নি। গণভোট হলে ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের পৃথক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশন কাউন্সিলের (এসটিসি) বাহিনীও এখন পর্যন্ত পুরোনো দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে তাদের সেনাদের অভিযান চালানোর অনুমতি দেয়নি। সৌদি আরব গণভোটে সম্মতি দিলে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংঘাতের মধ্যে সীমিত অগ্রগতি
জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার গত সপ্তাহে হুতিদের কাছ থেকে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে পাল্টা অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। তবে মারিবের কাছে মাজজার ও বাব আল-মান্দাব প্রণালি এলাকায় সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত সীমিত সাফল্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এসটিসি নেতা এইদারুস আল-জুবাইদি ও সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও নেই। দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং দুই বছরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গত জানুয়ারিতে আবুধাবিতে চলে যান জুবাইদি। এরপর এসটিসি বাহিনীর জন্য পাঠানো ইউএইর অস্ত্রের চালানে সৌদি আরব বোমা হামলা চালায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এরপর ইয়েমেনে সব ধরনের সম্পৃক্ততা বন্ধের ঘোষণা দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার জুবাইদিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানায়।
এডেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, হতাহতের ঘটনা
ইয়েমেনের সংঘাতের মধ্যে এডেনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র এডেন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানে। ওই সময় একটি যাত্রীবাহী বিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে এ ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-এরিয়ানির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ইয়েমেনিয়া এয়ারওয়েজের বিমান থেকে প্রায় ৫০০ মিটার এবং রানওয়ের মাঝামাঝি অংশ থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে আঘাত হানে।
এর আগের দিন এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হুতিদের হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরবকে সহায়তায় মিসর ও যুক্তরাজ্যের ভূমিকা
সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা চলছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জানিয়েছেন, সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে দেশটির সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিতে তিনি পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন ডাকছেন। তবে মিসর কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেবে না, কেবল সৌদি আরবকে রক্ষায় সহায়তা করবে বলে তিনি জোর দিয়েছেন।
অন্যদিকে সৌদি আরবকে আরও সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে যুক্তরাজ্যেও আলোচনা চলছে। দেশটি ইতিমধ্যে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি ভয়েজার আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান পাঠিয়েছে। তবে সৌদি আরবকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া এবং ওমান ও কাতারসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলায় যুক্তরাজ্যের সমর্থনের আইনি দিকও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত রায় দিয়েছিলেন, ২০১৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইয়েমেনে সৌদি আরবের বোমা হামলার সময় অস্ত্র রপ্তানির অনুমতিপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির সরকার বেআইনি পদক্ষেপ নিয়েছিল।
ক্যাম্পেইন অ্যাগেইনস্ট আর্মস ট্রেডের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনে সৌদি আরবের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাজ্য যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে অস্ত্র রপ্তানি অনুমোদনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয় দেশটি।
সৌদি আরবের দাবি, পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে এবং জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত ১৫ অক্টোবর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গৃহীত এক প্রেসিডেন্সিয়াল বিবৃতিতেও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত দুই লাখের বেশি মানুষ
গত আগস্ট থেকে চলা সংঘাতে মোট কতজন নিহত হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এতে এডেনভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়লেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য সংঘাতের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

































