বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে আশার আলো
Published : ১৮:০৯, ১০ আগস্ট ২০২৬
কূটনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই; থাকে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক প্রয়োজন এবং আলোচনার সুযোগ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের যোগাযোগ অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক সৌজন্য সাক্ষাৎকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে এটিই তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ। নানা ইস্যুতে অস্বস্তি, অনাস্থা ও উত্তেজনা থাকলেও এই বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশের সম্পর্কের দরজা বন্ধ করা হচ্ছে না।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে সংকট যত গভীর হয়, সংলাপের প্রয়োজনও তত বাড়ে। রাজনৈতিক দূরত্বকে দীর্ঘমেয়াদি বৈরিতায় রূপ না দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজাই উভয় দেশের স্বার্থে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বিভিন্ন ক্ষেত্রে টানাপোড়েন দেখা দেয়। ভিসা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা, কূটনৈতিক পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি তলব, সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ দুর্বল হয়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমও বিভিন্ন বাধার মুখে পড়ে।
তবে রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা পরস্পরকে গভীরভাবে যুক্ত রেখেছে। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। পণ্য আমদানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, নদীর পানি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বহু বিষয় দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা জটিলতা, সীমান্ত সমস্যা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও ঢাকার অস্বস্তি রয়েছে। সীমান্তে পুশইন ও সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনাও সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর মধ্যেই ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর দায়িত্ব গ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে ভারতের একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ, যোগাযোগ ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও তাঁর একাধিক বৈঠক হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বও বিশেষভাবে রয়েছে। কোনো পণ্যের ঘাটতি দেখা দিলে প্রতিবেশী দেশ থেকে দ্রুত আমদানির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল করার সুযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের পাশাপাশি ভারতসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন।
পানি বণ্টনের বিষয়টিও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, তিস্তার পানি এবং অভিন্ন নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এসব অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, ধারাবাহিক সংলাপ এবং পারস্পরিক আস্থার প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধুত্ব মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। আবার মতপার্থক্য মানেই শত্রুতা নয়। একটি পরিণত রাষ্ট্র জাতীয় স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ ও সংবেদনশীলতাকেও বিবেচনায় রাখে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে না দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার না হওয়ার নিশ্চয়তা চায় ঢাকা।
ভারতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা—দুই দেশকে সমমর্যাদার প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, ভিসা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ সংবেদনশীল প্রতিটি বিষয়ে পারস্পরিক সম্মান ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অর্থ কোনো দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, অর্থনীতি এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাংলাদেশ ও ভারতকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। ফলে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা ও সংলাপই হতে পারে ভবিষ্যতের কার্যকর পথ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক সেই নতুন পথচলার একটি সূচনা হতে পারে। সামনে মতপার্থক্য ও কঠিন ইস্যু থাকলেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সব বিষয়ে মতৈক্য প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্মান এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের মানসিকতা।
অতীতের তিক্ততা পেছনে রেখে বাংলাদেশ ও ভারত যদি সমতা, আস্থা, পারস্পরিক সম্মান এবং জাতীয় স্বার্থকে ভিত্তি করে এগিয়ে যায়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন একটি ইতিবাচক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।































