ইউনূস সরকারের ১৮ মাস: সংবিধান লঙ্ঘন থেকে দুর্নীতি—উঠেছে যেসব গুরুতর অভিযোগ
Published : ১৪:৪৮, ১৭ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনকাল নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সংবিধান লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার, মৌলিক অধিকার হরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অবহেলার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কিছু সরাসরি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে, আবার কিছু তার নেতৃত্বাধীন সরকারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অভিযোগ ওঠা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
সংবিধান পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন
ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় অভিযোগ সংবিধান সংশোধন ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে। ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এর মাধ্যমে সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। সংসদের অনুমোদন ছাড়া নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা সাংবিধানিকভাবে বৈধ কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে।
এ ছাড়া সংবিধানে গণভোটের বিদ্যমান বিধান না থাকা সত্ত্বেও গণভোট আয়োজনের জন্য অধ্যাদেশ জারির বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
মৌলিক অধিকার নিয়ে অভিযোগ
সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের বিভিন্ন মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইউনূস সরকারের সময়ে এসব অধিকারের একাধিক ক্ষেত্রে লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘ সময় আটক রাখা, মামলা, ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদে হস্তক্ষেপ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে অনেকে যথাযথ আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এ ছাড়া সাংবাদিক, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাজীবীর ওপর চাপ, হামলা ও হয়রানির অভিযোগও সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরির অভিযোগের কারণে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিদেশি চুক্তি ও সহযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন
চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে ইউনূস সরকারের সময়ে বিভিন্ন চুক্তি, সমঝোতা ও ক্রয়-আলোচনার খবর সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এসবের মধ্যে যেগুলো সাংবিধানিক অর্থে আন্তর্জাতিক চুক্তি, সেগুলো সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও সংসদের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল কি না। এ বিষয়টি সরকারি নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ইউনূস-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়ে স্বার্থের প্রশ্ন
ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রতিষ্ঠিত বা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন, লাইসেন্স, কর-সুবিধা কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ অনুমোদন, গ্রামীণ অ্যামপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পেমেন্ট সার্ভিস কার্যক্রমের অনুমোদন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ। এসব সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত প্রভাব বা স্বার্থ কাজ করেছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ
প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান কয়েকটি মামলায় দ্রুত পরিবর্তন বা নিষ্পত্তির ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অর্থপাচার, শ্রম আইন ও আয়কর-সংক্রান্ত মামলাগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নির্বাহী ক্ষমতার কোনো ধরনের প্রভাব বা হস্তক্ষেপ ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি উঠেছে।
তবে আদালতের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে নির্বাহী হস্তক্ষেপের ফল হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সংশ্লিষ্ট নথি, আদেশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।
দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের অবৈধভাবে অর্থ বা সুবিধা অর্জনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি পদে থাকার সময় নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য কর-সুবিধা, অনুমোদন, লাইসেন্স বা অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের নথি, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ এবং ড. ইউনূসের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন।
হাম টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে অবহেলার অভিযোগ
ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে শিশুদের হাম প্রতিরোধী টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের গাফিলতির কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং এর ফলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
তবে কোনো নীতিগত বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার সঙ্গে নির্দিষ্ট মৃত্যুর সরাসরি কারণগত সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় রয়েছে কি না, তা চিকিৎসা তথ্য, সরকারি নথি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে।
তদন্তের দাবি
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
সংবিধান লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, মৌলিক অধিকার হরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, আন্তর্জাতিক চুক্তি-সংক্রান্ত অনিয়ম ও প্রশাসনিক অবহেলার অভিযোগগুলো পৃথকভাবে তদন্তের প্রস্তাব রয়েছে। এ জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য, সরকারি নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।
সবশেষে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রমাণ না মিললে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো—এই নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, আবার কেবল অভিযোগের ভিত্তিতেও কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না।






























