ক্ষমতার প্রথম ছয় মাসে বিএনপি সরকারের যত অর্জন

ক্ষমতার প্রথম ছয় মাসে বিএনপি সরকারের যত অর্জন ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১২:৫৪, ১৭ আগস্ট ২০২৬

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরা দলটির সরকার সম্প্রতি ছয় মাস পূর্ণ করেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

সরকারের প্রথম ছয় মাসের বিভিন্ন উদ্যোগ পর্যালোচনা করে বিশ্লেষকরা কয়েকটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছেন।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য এসেছে কূটনৈতিক অঙ্গনে। গত ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির এটিকে বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীন। ২১ থেকে ২৬ জুন অনুষ্ঠিত ওই সফরে দুই দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয় বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডর, তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কাঠামো নিয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এ ছাড়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছেন তারা।

সামাজিক নিরাপত্তায় নতুন উদ্যোগ

সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও সরকারের কয়েকটি উদ্যোগ ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিকে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষাবলয় তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনের মতে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারের সহায়তা আরও কাঠামোবদ্ধ হতে পারে।

ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ

অর্থনৈতিক খাতে ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যেই দায়িত্ব নেয় নতুন সরকার। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ সংকট ছিল সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে এগোচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

আগে একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংককে পুনরায় কার্যকর করার উদ্যোগকেও তিনি সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ

সরকার গঠনের পর সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপও আলোচনায় এসেছে।

রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার ও সরকারি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এসব উদ্যোগকে সরকারের দায়িত্বশীলতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুর উদ্যোগ

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা পুনরায় চালুর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অন্যান্য সংকটে যেসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, সেগুলো পুনরায় চালু হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, তহবিলটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে সরকারের অগ্রসর হওয়ার প্রবণতাকেই এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা উচিত।

সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন

সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীও। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব অঙ্গীকার করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

তার দাবি, গত ছয় মাসে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বড় একটি অংশ পূরণ হয়েছে।

সব মিলিয়ে জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব, চীনের সঙ্গে একাধিক সমঝোতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, শিল্প-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ—এসব ক্ষেত্রকে সরকারের প্রথম ছয় মাসের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement