চুল কাটতে বেরিয়ে ৭ মাস পর এক পা হারিয়ে ফিরল ১২ বছরের রায়হান
Published : ১১:১৭, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। সাত মাস পর সেই শিশুই বাড়িতে ফিরেছে এক পা হারিয়ে। পেটের ডান পাশ ও পিঠে রয়েছে অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ দাগ। শিশুটিকে পঙ্গু করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর পাশাপাশি তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে পরিবার।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে রায়হান। গত সাত মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয়রা তাকে চিনতে পারেন। পরে খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন তার বাবা।
রায়হানের ভাষ্য, চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজারে যায়। সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় আসে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কয়েকজন তাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে চারপাশে বাগান এবং মাঝখানে একটি ঘর ছিল। সেখানে তার মতো আরও অনেক শিশু ছিল বলে জানায় সে।
রায়হান দাবি করে, একদিন রাতে সেখানে ঘুমানোর পর সকালে উঠে সে দেখতে পায় তার একটি পা নেই। বিষয়টি জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, ট্রেন দুর্ঘটনায় তার পা কাটা গেছে। এরপর প্রতিদিন তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করানো হতো এবং ভিক্ষার টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো। সেখানে দুই পুরুষ ও সালমা নামের এক নারী ছিল বলেও জানায় শিশুটি। তার দাবি, ওই জায়গায় আরও অনেকের হাত-পা কাটা ছিল।
পরে একপর্যায়ে তাকে বাসে তুলে দেওয়া হলে সে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় চলে আসে বলে জানায় রায়হান।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, তার ছেলে হেফজখানায় পড়ত। কিছুটা দুষ্টুমি করত বলে মাঝে মাঝে তাকে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতেন। সাত মাস আগে ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে পাঠানোর পর সে কক্সবাজার চলে যায় এবং পরে ঢাকায় নেওয়া হয় বলে ছেলের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, মাহফিলে একজন লোক রায়হানকে দেখে তাকে খবর দেন। সেখানে গিয়ে ছেলেকে এক পা ছাড়া অবস্থায় দেখে বাবা-ছেলে দুজনই কান্নায় ভেঙে পড়েন। অভাবের কারণে ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় জিডি করতে পারেননি বলেও জানান তিনি।
লোহাগাড়া থানায় আইনি সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন নাজিম উদ্দিন। তার দাবি, ছেলেকে উদ্ধারের পর থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ জানায়, ঘটনাটি কমলাপুরের হওয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করতে হবে। ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই বলেও জানান তিনি।
রায়হানের সৎমা ফয়জুন্নেসা বলেন, চুল কাটতে গিয়ে সাত মাস পর ছেলেকে ফিরে পেলেও তার একটি পা নেই। পেটেও অস্ত্রোপচারের বড় দাগ রয়েছে। সন্তানের সঙ্গে এমন নিষ্ঠুরতার বিচার দাবি করেন তিনি।
মাহফিল এলাকায় রায়হানকে প্রথম দেখতে পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী জানান, রাত ১২টার পর ভিড়ের মধ্যে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখেন তিনি। মুখ পরিচিত মনে হওয়ায় কাছে গিয়ে নাম জানতে চাইলে শিশুটি নিজেকে নাজিম মিয়ার ছেলে রায়হান বলে পরিচয় দেয়। পরে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তার বাবাকে খবর দেওয়া হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, সাধারণ একটি পরিবারের ১২ বছরের শিশুর সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত বর্বর। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
মানবাধিকার কর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদীও ঘটনাটিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, শিশুটির বক্তব্য অনুযায়ী একটি চক্র তার জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তবে রায়হান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ। লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক এ তথ্য জানান।
পুলিশ পরিদর্শক প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রায়হান প্রথমে প্রায় এক মাস কক্সবাজারে ছিল এবং পরে তাকে কমলাপুরে নেওয়া হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রায়হান নিখোঁজ থাকার সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। ওই ভিডিওতে শিশুটিকে বলতে দেখা যায়, জায়গা সংক্রান্ত মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমায়ের মারধরের কারণে সে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় এসেছে। তবে পরিবারের সদস্যদের দাবি, ভয় দেখিয়ে বা কারও শেখানো কথা অনুযায়ী শিশুটি ওই বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে।
এদিকে মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান দাবি করেছেন, গত সাত মাসে দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু নিখোঁজ হয়েছে এবং এসব ঘটনার পেছনে শিশু পাচার, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার কিংবা ভিক্ষাবৃত্তির চক্র জড়িত কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিএইচএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনও নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজদের বড় একটি অংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
বিএইচএফের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নিখোঁজ শিশুদের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষাবৃত্তির চক্রের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নিখোঁজ শিশুদের জন্য সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ এবং জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রায়হানের পরিবারের অভিযোগ এবং শিশুটির দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা এখন তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।






























