বিএনপি সরকারের ছয় মাস: সংস্কার, অর্থনীতি ও জনকল্যাণে অগ্রগতির দাবি
Published : ১১:৩৬, ১৭ আগস্ট ২০২৬
সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের ছয় মাস পূর্ণ করেছে বিএনপি। রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রশাসনিক জটিলতা, অর্থনৈতিক চাপ ও জ্বালানি সংকটের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারে অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে দাবি করেছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রমের মূল্যায়নে অর্থনীতি, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসব উদ্যোগের বিস্তারিত জানাতে সোমবার (১৭ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের কথা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি ই-বুক ও তথ্যবহুল পুস্তিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সরকার জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণকে ভিত্তি করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে। তাঁর দাবি, গত ছয় মাসে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে জোর
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৬-২০৩১ মেয়াদে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ৯৩ লাখ ২৭ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি খাদ্যগুদামে ২৪ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত থাকার কথাও জানানো হয়েছে। এর মধ্যে চাল প্রায় ১৯ লাখ ৬০ হাজার টন এবং গম প্রায় ২ লাখ ৯৬ হাজার টন।
এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়ার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে আনার উদ্যোগও সরকারের অর্জনের তালিকায় রয়েছে।
কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা
কৃষক, নারী, শিক্ষার্থী, প্রবাসী, প্রবীণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন কার্ড ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালুর কথা জানিয়েছে সরকার। ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণ মওকুফ, ১৫ টাকা কেজি দরে খাদ্য সহায়তা, নারী উদ্যোক্তা ও তরুণদের সহজ ঋণ এবং স্টার্টআপ তহবিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড এবং ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মানি দেওয়ার কর্মসূচি চালুর কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিতে উদ্যোগ
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে স্মার্ট ক্লাসরুম, নতুন পাঠ্যক্রম, বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে ঢাকায় বৈদ্যুতিক বাস চালু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ এবং নতুন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কথাও জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে মালয়েশিয়া ও চীন সফর
সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছে সরকার।
২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা হয়। চলতি আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে।
২৪-২৬ জুন চীন সফরে বাণিজ্য, অবকাঠামো, কৌশলগত সহযোগিতা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দাবি করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ
তবে সরকারের ছয় মাসের পথচলায় জ্বালানি সংকটকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি এফএসআরইউ নষ্ট হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি জানান, সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পেট্রোনাসসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন নিয়েও কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
ব্যয় সংকোচন ও প্রশাসনিক সংস্কার
সরকারি ব্যয় কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার। সরকারি অনুষ্ঠানে নেতাদের ছবি ব্যবহার, বিশেষ ভিআইপি চেয়ার, দীর্ঘ পরিচয় ঘোষণা ও ব্যক্তিবন্দনার সংস্কৃতি বন্ধের কথা বলা হয়েছে।
বিদেশ সফরের প্রতিনিধিদল, আপ্যায়ন ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা অনুসরণের উদাহরণ তৈরি করছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
সংসদ ও আইনশৃঙ্খলা
সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, ত্রয়োদশ সংসদের ৫২টি কার্যদিবসে ১০৫টি বিল পাস হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের আলোচিত মামলার দ্রুত বিচার, দীর্ঘদিন পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ছয় মাস একটি দেশের আমূল পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। তবে এই সময়ে নেওয়া সংস্কার ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি তৈরি করেছে।


































