প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন, স্বপ্ন বুনছেন বান্দরবানের ১০০ নারী

প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন, স্বপ্ন বুনছেন বান্দরবানের ১০০ নারী ছবি: সংগৃহীত

বান্দরবান প্রতিনিধি

Published : ১৮:০৩, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে অসচ্ছল নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। জেলার পাঁচ উপজেলার ১০০ নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি করে সেলাই মেশিন। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে প্রত্যেক নারীকে দেওয়া হয়েছে দুটি করে গাছের চারা।

বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগিতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলমান সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন বিতরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বান্দরবানেও এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। লামা দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ পর্যায়ক্রমে আলীকদম, বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি হয়ে রুমা উপজেলায় শেষ হয়। প্রতিটি উপজেলা থেকে ২০ জন করে মোট ১০০ অসচ্ছল নারী এই সহায়তা পেয়েছেন।

সম্প্রতি রুমা উপজেলার মুনলাই পাড়া কালচারাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় কর্মসূচির শেষ পর্ব। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি সম্প্রদায়ের ২০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেন বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রতিনিধিরা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রুমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মানস বড়ুয়া, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মো. জাবেদ রাউজান, রুমা অগ্রবংশ অনাথালয়ের পরিচালক নাইন্দিয়া থের, স্থানীয় পাড়াপ্রধানসহ বিএনপির নেতারা।

পাহাড়ি এই উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। ফলে পরিবারের ব্যয় সামলানোর পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেক নারীর জন্য কঠিন। প্রশিক্ষণের পর সেলাই মেশিন হাতে পাওয়ায় তাঁদের সামনে ঘরে বসে আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রুমা অগ্রবংশ অনাথালয়ে বেড়ে ওঠা নাইউচিং মার্মার জীবনেও এই সহায়তা নতুন আশার সঞ্চার করেছে। শৈশবেই মা-বাবাকে হারানো নাইউচিং অনাথ আশ্রমে থেকে পড়াশোনা করেছেন। সেলাই মেশিন পেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয়েছে তাঁর।

নাইউচিং মার্মা বলেন, ‘ছোট থেকে অনাথ আশ্রমেই বড় হয়েছি। এই সেলাই মেশিন আমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস আরও বাড়িয়ে দিল।’

একই অনুষ্ঠানে মেশিন পেয়েছেন চাময়া ম্রো। বাবা মেনয়াং ম্রোর মৃত্যুর পর মানসিকভাবে অসুস্থ মাকে নিয়ে দুই বোনের সংসার। জুম চাষের পাশাপাশি বান্দরবান সরকারি কলেজে অনার্সে পড়াশোনা করছেন চাময়া। তাঁর আশা, সেলাইয়ের কাজ থেকে আয় করে নিজের পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ চালাতে পারবেন।

চাময়া ম্রো বলেন, ‘এটি আমার জন্য নতুন আয়ের পথ তৈরি করবে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। বসুন্ধরাকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’

রুমা থানার ওসি মানস বড়ুয়া বলেন, দুর্গম এলাকার অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে সেলাই মেশিন বিতরণ কার্যকর উদ্যোগ। এর মাধ্যমে তাঁরা নিজেরা আয় করার পাশাপাশি পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারবেন।

উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মো. জাবেদ রাউজান বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীরা যেমন দক্ষতা অর্জন করছেন, তেমনি মেশিন পাওয়ার পর সেই দক্ষতাকে আয়ে রূপ দেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সমাজকল্যাণে এমন উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।

রুমা অগ্রবংশ অনাথালয়ের পরিচালক নাইন্দিয়া থেরও উদ্যোগটির প্রশংসা করে বলেন, দুর্গম এলাকার নারী ও কিশোরীদের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হলে তাঁরা ভবিষ্যতে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

বসুন্ধরা শুভসংঘ জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন বিতরণ কর্মসূচির মাধ্যমে ইতোমধ্যে তিন হাজারের বেশি নারী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বান্দরবানের পাঁচ উপজেলার ১০০ নারীকে প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন দেওয়াও সেই ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি সেলাই মেশিন শুধু একটি যন্ত্র নয়—এটি অনেক নারীর জন্য নিজের আয়, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement