ছবি নয়, ইতিহাসের পূর্ণ প্রেক্ষাপটই গুরুত্বপূর্ণ

ছবি নয়, ইতিহাসের পূর্ণ প্রেক্ষাপটই গুরুত্বপূর্ণ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৫:৩৫, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি ছবি বা প্রতীকের উপস্থিতি দিয়ে ইতিহাসের মূল্যায়ন করা যায় না; বরং একটি ঐতিহাসিক চরিত্র, ঘটনা ও তার ভূমিকার পূর্ণ প্রেক্ষাপট নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই ইতিহাস সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি সামনে আসার পর ইতিহাসের উপস্থাপনা নিয়ে এই প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সম্প্রতি সংস্কারের পর ডাকসুর সংগ্রহশালায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন কিছু ছবি ও দলিল যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ঢাকার একটি ভাষণের ছবি, ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনের একটি দলীয় ছবি এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন-সংক্রান্ত সংবাদপত্রের কাটিং রয়েছে। পাশাপাশি আবদুল মালেকের ছবি ও তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিও প্রদর্শিত হয়েছে। ডাকসু সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ছবি কোনো ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করার জন্য নয়; বরং সংশ্লিষ্ট সময়ের ইতিহাসের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় দেখলে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই বাংলাভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নটি সামনে আসে। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের কার্যক্রমে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার দাবি উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে ভাষার অধিকারকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রূপ নেয়।

অন্যদিকে, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক ভাষণে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেন। বাংলাপিডিয়ার ভাষা আন্দোলনবিষয়ক বিবরণেও তাঁর ওই অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে। জিন্নাহ একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ফলে পরবর্তী ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি জীবিত ছিলেন না।

আবদুল মালেকের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয়ের পাশাপাশি তৎকালীন ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরা প্রয়োজন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা-নীতিকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। ওই সময় ইসলামী ছাত্র সংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবদুল মালেক একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেন এবং পরে সংঘর্ষে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সমসাময়িক সংবাদপত্র ও পরবর্তী গবেষণায় ঘটনাটির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে; তবে তাঁকে হত্যার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করার বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটও ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ও বিচারিক নথিতে তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘ এবং আল-বদরসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত একটি রায়েও ইসলামী ছাত্র সংঘকে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের ছাত্র সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে ১৯৭১ সালের আল-বদর ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ এসেছে।

তাই কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের ছবি কোনো আর্কাইভ বা সংগ্রহশালায় রাখা মানেই তার রাজনৈতিক অবস্থান, কর্মকাণ্ড বা আদর্শের প্রতি সমর্থন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রয়োজন নেই। একইভাবে শুধু ছবি প্রদর্শন করলেই ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপিত হয় না। ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়, বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান, ভূমিকা, সমালোচনা এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক পরিণতিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলো—১৯৪৮ সালের ভাষার অধিকার নিয়ে দাবি, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—পরস্পর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এসব ঘটনা দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ তৈরি করেছে।

সুতরাং একটি সংগ্রহশালার দায়িত্ব কেবল পরিচিত বা জনপ্রিয় চরিত্রের ছবি প্রদর্শন করা নয়; বরং ইতিহাসের বিভিন্ন পক্ষ, ঘটনা ও দলিলকে যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্য সূত্রসহ উপস্থাপন করা। কোনো চরিত্রের ইতিবাচক বা নেতিবাচক ভূমিকা গোপন না করে তার সময়কাল, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের প্রমাণ সামনে রাখলে দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ইতিহাসের মূল্যায়ন করতে পারেন।

ইতিহাস থেকে কোনো ঘটনা মুছে ফেলা যেমন ইতিহাসচর্চাকে অসম্পূর্ণ করে, তেমনি প্রেক্ষাপট ছাড়া কোনো ছবি প্রদর্শনও বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই ডাকসুসহ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগ্রহশালায় ছবি, দলিল, বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করাই হতে পারে ইতিহাস সংরক্ষণের কার্যকর পদ্ধতি।

 
শেয়ার করুনঃ
Advertisement