গুম প্রতিরোধের নতুন বিলে কঠোর শাস্তি, তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

গুম প্রতিরোধের নতুন বিলে কঠোর শাস্তি, তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন লোহার রড দুই হাতে শক্ত করে ধরে রাখার দৃশ্য। ছবি: গেটি ইমেজেস

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১১:০৮, ৩০ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপিত নতুন বিল নিয়ে ইতিবাচক ও সমালোচনামূলক—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই তৈরি হয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগী মারা গেলে বা পাঁচ বছর পরও তার সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এর আগে ২০২৫ সালে গুম প্রতিরোধে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় সেই অধ্যাদেশের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। পরে বিষয়টি পর্যালোচনা করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় বর্তমান সরকার।

উত্থাপিত বিলে গুমের একটি আইনি সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মচারী, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা সরকারের অনুমোদনে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান অস্বীকার করা কিংবা গোপন রাখাকে গুম হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

বিলে গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি জানার অধিকার, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সাক্ষী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে বিলটির সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে তদন্তের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হলেও নতুন বিলে তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোর মধ্যেই রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে একই ধরনের বাহিনীর মাধ্যমে তদন্ত কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাদের মতে, গুমের মতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর অপরাধ তদন্তে একটি পৃথক, স্বাধীন ও বিশেষায়িত সংস্থা থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনী তদন্ত করলে সেটি কতটা স্বাধীন হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার কতটা আস্থা পাবে—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, তদন্তের দায়িত্ব পৃথক কমিশন বা বেসামরিক প্রশাসনের মতো স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া প্রয়োজন।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমানও মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই তদন্তের দায়িত্ব থাকলে আইনের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় থাকবে। গুমের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ কমিশন বা ইস্যুভিত্তিক বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের পক্ষে মত দেন তিনি।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বিলটির আরও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের অধিকার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। পাশাপাশি আসামির সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার সুযোগ আইনে থাকায় অপরাধীদের পার পাওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, গুমের মতো জটিল মামলায় সাক্ষী সুরক্ষা, প্রমাণ সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সময়সীমা অমান্য করলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে গুমের অভিযোগ তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিশন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা প্রণয়ন এবং আইন প্রণয়নের উদ্যোগের পরও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে গুমের ঘটনা আবারও ফিরে আসছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে নতুন বিলটি গুমকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও তদন্তের স্বাধীনতা, ভুক্তভোগীর অধিকার, সাক্ষী সুরক্ষা এবং আইনের বাস্তব প্রয়োগ—এই বিষয়গুলোই এর কার্যকারিতার প্রধান পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুনঃ
Advertisement