নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা: নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার, উদ্ধার ৬৮২ মরদেহ

নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা: নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার, উদ্ধার ৬৮২ মরদেহ ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Published : ১১:০৫, ৩০ আগস্ট ২০২৬

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক দিন পরও নিখোঁজ হাজারো মানুষের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারীরা। দুই দেশের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। এ পর্যন্ত ৬৮২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বন্যার স্রোতে কিছু মরদেহ ভারতের নদী পর্যন্ত ভেসে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

শনিবার রাতে উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। নেপালের সেনাবাহিনী ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে পাইপ ঢোকাতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে শতাধিক শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং জানিয়েছেন, ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে টানেলের ভেতরে বাতাস পাঠানো শুরু হয়েছে। এরপর সেখানে খননকাজ চালিয়ে উদ্ধারকারী দল প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হবে। ত্রিশূলী-৩এ ও ৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোতেই উদ্ধার তৎপরতা বেশি জোরদার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে যে ভয়াবহ পানির ঢল নেমে আসে, তার পেছনে ছিল হিমবাহ ধস। তবে হিমবাহ ধসের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে হিমবাহ দ্রুত গলছে, ফলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিল বলেন, আকস্মিক হিমবাহ ধস ও বন্যা পাহাড়ি পরিবেশের ভঙ্গুরতার ভয়াবহ স্মারক। মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের কারণে এ ধরনের দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বন্যায় নেপালের নদীতীরবর্তী বহু জনপদ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। নুওয়াকোট জেলার এক বাসিন্দা বুড্ডি রাম ডাঙ্গোল বলেন, নদীর আশপাশের সব বসতি পানির স্রোতে ভেসে গেছে; সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী এবং ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। বিদেশিদের মধ্যে পর্যটক ও তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

এদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত গিয়েরং সীমান্ত বন্দরও ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হওয়ায় আরও বন্যার আশঙ্কায় কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান স্থগিত রাখা হয়। পরে চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, হ্রদটির পানি স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে যাচ্ছে এবং তা প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্কাশিত হয়েছে।

শনিবার নেপাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ফোনে কথা বলে স্যাটেলাইট ও জলবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে আলোচনা করেন।

নেপালে শনিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৬৭৫ জন বলে জানানো হয়েছে। দেশটিতে ২ হাজার ৪২৬ জনের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিব্বতে আরও সাতজনের মৃত্যু এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া।

এদিকে ভারতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপাল থেকে নেমে আসা নদীগুলো থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষের মরদেহ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে প্রাথমিকভাবে আরও ৫ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, পুনর্গঠনে কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিখোঁজদের উদ্ধার ও মানুষের জীবন রক্ষা করা। আটকে পড়াদের শনাক্ত করতে ভারী মালামাল বহনে সক্ষম ড্রোন, আধুনিক প্রযুক্তি, মরদেহ শনাক্তের ফরেনসিক কিট এবং মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজার ইউনিটের প্রয়োজন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement