সরকারের কার্যক্রম নজরদারিতে জামায়াতের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’
Published : ১১:৪৭, ৩০ আগস্ট ২০২৬
সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, গঠনমূলক সমালোচনা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিকল্প নীতিপ্রস্তাব দিতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ গঠন করেছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমান মন্ত্রিসভার শপথের পর থেকেই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত মাস থেকে এর কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমে একজন প্রধানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক ছাত্রশিবির নেতা এবং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের রাখা হয়েছে।
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানান, ছায়া মন্ত্রিসভা ইতোমধ্যে গঠন করা হয়েছে এবং সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে। নির্দিষ্ট সময়ে এর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
যেভাবে গঠন করা হয়েছে
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে এসেছে। এই ব্যবস্থায় বিরোধী দল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প নীতির প্রস্তাব দেয়। যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের কাঠামো রয়েছে।
জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভায় দলটির শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সাবেক আমলাদের যুক্ত করা হয়েছে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী ধরে এই কাঠামো সাজানো হয়েছে। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলটির শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্যদের।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। সমাজকল্যাণে মুজিবুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মোহাম্মদ শিশির মনির দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ড. ইলিয়াস মোল্লা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মাওলানা আব্দুল হালিম, যুব ও ক্রীড়ায় সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, পরিবেশে মারদিয়া মমতাজ, পানিসম্পদে শফিকুল ইসলাম মাসুদ, জনপ্রশাসনে রফিকুল ইসলাম খান, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সাবিকুন্নাহার মুন্নি এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ে কামাল হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সমন্বয়ক ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকারের কার্যক্রমের ভালো-মন্দ পর্যবেক্ষণ এবং সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতেই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, সরকারের ভালো উদ্যোগগুলো যেমন তুলে ধরা হবে, তেমনি ভুলত্রুটিও জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ছায়া মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কবে দেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হবে। তবে এরই মধ্যে সদস্যরা কার্যক্রম শুরু করেছেন।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের ওপর আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভাকে কটাক্ষ করে ‘উজিরে খামোখা’ বলে মন্তব্য করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করলে বিরোধী দলের দায়িত্ববোধ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান জামায়াতের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, গণতন্ত্রের জন্য ছায়া মন্ত্রিসভা একটি ভালো উদ্যোগ এবং এর মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব।
তিনি বলেন, বিরোধী দল সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরার পাশাপাশি ভালো কাজের প্রশংসা করতে পারে এবং কোথায় কীভাবে আরও ভালো করা সম্ভব, সেই পরামর্শও দিতে পারে।

































