২৫০ ব্যক্তিকে গুমের অভিযোগে প্রস্তুত হচ্ছে মামলা
Published : ১১:২৯, ৩০ আগস্ট ২০২৬
আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ২৫০ ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা প্রস্তুত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়। এসব অভিযোগের মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনাও রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, অভিযোগগুলো তদন্তে গুম বিষয়ে অভিজ্ঞ পাঁচ তদন্ত কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্তদল কাজ করছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম নিজে তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করছেন। সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের চেষ্টা চলছে।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গুম হওয়া এবং এখনো সন্ধান না পাওয়া ২৫০ ব্যক্তির অভিযোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ বিশ্লেষণ করে একই ধরনের পদ্ধতিতে গুমের ঘটনা ঘটানোর তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি প্রসিকিউশনের। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কিংবা সাদা পোশাকে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ গুমের অভিযোগ চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫০টি অভিযোগের তদন্ত চলছে। এসব অভিযোগের ১৫০টি এসেছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ থেকে, ৬০টি ‘আমরা গুম পরিবার’ থেকে এবং বাকি ৪০টি বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছে।
তদন্তে ভুক্তভোগীদের পরিবারের বক্তব্য, ছবি, সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও বিভিন্ন ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। ২৫০ ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গণশুনানিরও আয়োজন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গত ২৫ আগস্ট ৬০টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় পরবর্তী বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন এনে জোরপূর্বক গুমসহ অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় আনা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় ও তদন্ত সংস্থায় গুমের অভিযোগ জমা পড়তে শুরু করে।
সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়াতেও বলা হয়েছে, ব্যাপক বা পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত গুম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারযোগ্য হবে।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২৫০টি অভিযোগের প্রতিটির জন্য আলাদা অভিযোগ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সব অভিযোগের বিচার একসঙ্গে করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, এতে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি একই বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব ভুক্তভোগীর ঘটনা বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হবে।
ট্রাইব্যুনালে তিন মামলার বিচার চলছে
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুমসংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ‘টিএফআই সেল’ ও ‘জেআইসি’ নামে পরিচিত দুটি মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
টিএফআই সেল মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জন আসামি রয়েছেন। মামলাটিতে ইতোমধ্যে সাতজন সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং আগামী ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারিত রয়েছে।
জেআইসি মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলাতেও সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে এবং ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে পৃথক একটি মামলাও বিচারাধীন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে ওই মামলায়। এ মামলায় এ পর্যন্ত নয়জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আরও ১০ মামলার তদন্ত
চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুমের অভিযোগে আরও ১০টি মামলার তদন্ত চলছে। এর মধ্যে সাতটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এবং তিনটি ট্রাইব্যুনাল-২-এর অধীনে তদন্তাধীন। এসব মামলায় মোট ২২ জন আসামি রয়েছেন।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়ার পর এসব মামলার প্রতিবেদনও পর্যায়ক্রমে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ































