জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে রাষ্ট্রের ভূমিকা হোক নিয়ন্ত্রকের
Published : ১৪:২৮, ১২ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তারের কারণে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় আমদানি, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও বিতরণ অবকাঠামো পর্যাপ্তভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে সরবরাহব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই এর প্রভাব পড়ছে শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
এ বাস্তবতায় জ্বালানি খাতে সরকারের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত নীতি প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিশ্চিত করা; আর বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, পরিচালনা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সক্ষম বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সুযোগ দেওয়া।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, রিফাইনারি স্থাপন, সংরক্ষণাগার নির্মাণ, পাইপলাইন, টার্মিনাল, পরিবহন ও বিতরণ—এসব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি তেল খাতের বড় অংশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে সরকারি ব্যবস্থাপনাই প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে দেশের অর্থনীতির আকার, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ যে গতিতে বেড়েছে, সে তুলনায় রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
দেশের অভ্যন্তরীণ পরিশোধন সক্ষমতাও চাহিদার তুলনায় সীমিত। ফলে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হলে এর প্রভাব দ্রুত দেশের বাজারে পড়ে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব পরিশোধন, মজুত ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এখানেই বেসরকারি বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে। দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে রিফাইনারি নির্মাণ, আধুনিক স্টোরেজ, টার্মিনাল, পাইপলাইন কিংবা পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইলে তাদের জন্য স্বচ্ছ ও সহজ বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি খাতে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাত পাশাপাশি কাজ করছে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জ্বালানি অবকাঠামোতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
তবে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার অর্থ সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা নয়। বরং বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়লে সরকারের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিরোধ, পণ্যের মান বজায় রাখা এবং ভোক্তাদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হতে হবে।
জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা তাই আরও বাড়াতে হবে। আমদানি ব্যয়, মূল্য নির্ধারণ, মজুত, পরিবহন, সরবরাহ ও বাজার প্রতিযোগিতার প্রতিটি স্তরে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ বা অস্বাভাবিক মুনাফা করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
মূল কথা হলো—সরকারের ভূমিকা ব্যবসায়ী হওয়ার চেয়ে রেফারির মতো হওয়াই বেশি কার্যকর। বাজারে একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকবে, কিন্তু নিয়ম সবার জন্য সমান হবে। যে প্রতিষ্ঠান দক্ষতা, প্রযুক্তি ও সেবার মাধ্যমে কম খরচে দ্রুত বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারবে, প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকবে।
বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থাও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক আমদানিকারক, রিফাইনারি, সংরক্ষণকারী ও সরবরাহকারী থাকলে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট পুরো বাজারকে অচল করে দিতে পারবে না। একটি উৎসে ঘাটতি তৈরি হলে অন্য উৎস তা পূরণ করতে পারবে। এতে সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বও কমবে না। সরকারি রিফাইনারি ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। তবে পাশাপাশি সক্ষম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এর ফলে দক্ষতা বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত শিল্প, পরিবহন ও সাধারণ ভোক্তারাই উপকৃত হবে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগও বাড়ানো সম্ভব। বড় রিফাইনারি, গভীর সমুদ্রবন্দরভিত্তিক জ্বালানি টার্মিনাল কিংবা বৃহৎ স্টোরেজ সুবিধা নির্মাণে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ যুক্ত হলে সরকারের আর্থিক চাপ কমার পাশাপাশি দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। নতুন রিফাইনারি, স্টোরেজ টার্মিনাল, পরিবহন নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, দক্ষ জনশক্তির চাহিদা এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে সরকার কর, ভ্যাট, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য উৎস থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারে।
তবে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শুধু সুযোগের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিশেষভাবে নীতির স্থিতিশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও বিনিয়োগ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেন।
কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা না দিয়ে সক্ষমতা, বিনিয়োগসামর্থ্য, প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা উচিত। এতে বাজারে আস্থা বাড়বে এবং প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে।
তবে পুরো প্রক্রিয়ায় জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে ভোক্তার অধিকার, ন্যায্য মূল্য, পণ্যের মান ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছাড়া বেসরকারি অংশগ্রহণ তাই কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি প্রতিটি কাজ নিজে করবে, নাকি এমন একটি কাঠামো তৈরি করবে যেখানে রাষ্ট্র নীতি ও নিয়ম নির্ধারণ করবে এবং সক্ষম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ও পরিচালনায় ভূমিকা রাখবে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় দ্বিতীয় পথটি অধিক কার্যকর হতে পারে।
সরকারকে তাই ধীরে ধীরে মালিকানাকেন্দ্রিক ভূমিকার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক, নীতিনির্ধারক ও তদারকির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকবে, কিন্তু তাদের পাশাপাশি একাধিক দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বাজারে থাকবে—এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোই জ্বালানি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও নিরাপদ করতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু কত জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। দেশের পরিশোধন সক্ষমতা কতটা বাড়ছে, মজুত সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, সরবরাহ কতটা বহুমুখী হচ্ছে এবং বাজারে কতটা কার্যকর প্রতিযোগিতা রয়েছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতির পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি খাতকেও পুরোনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রের শক্তি থাকা উচিত নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে; আর বেসরকারি খাতের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতার ক্ষেত্রে।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা গেলে জ্বালানি খাত আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও নিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। এর সুফল শুধু জ্বালানি সরবরাহে নয়, দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রতিফলিত হবে।
এমডিএইচ


































