ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে বাধা কোথায়, উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতি কেন?

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে বাধা কোথায়, উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতি কেন? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি

Published : ১৬:২০, ১৫ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের অন্যতম বড় শর্ত হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প-উৎপাদন সচল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এসব বিষয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশ্ন উঠছে—সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের সমন্বয় কতটা হচ্ছে?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি শক্তিশালী, উৎপাদনমুখী ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সামনে এনেছেন। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার যে লক্ষ্য তিনি সামনে রেখেছেন, তা বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’—এই স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছিলেন তারেক রহমান। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য ও উদ্যোগে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি রূপরেখাও সামনে আসে। সেই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

বেসরকারি খাতই মূল চালিকাশক্তি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প, উৎপাদন, রপ্তানি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আস্থাশীল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহ, প্রশাসনিক দক্ষতা ও ব্যবসার পরিবেশ বিবেচনা করেন। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মামলা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা-অগ্নিসংযোগ, অর্থপাচার সংক্রান্ত ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক চাপ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপর।

নির্দেশনা আছে, বাস্তবায়নে প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে একাধিক উদ্যোগ ও নির্দেশনা দিলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিবাচক বার্তা আসার পরও কোথাও কোথাও প্রশাসনিক ধীরগতি, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠছে।

বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনতে বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। এতে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট

বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ অপরিহার্য। চাঁদাবাজি, দখলদারি, মব সন্ত্রাস, হয়রানি কিংবা ব্যবসায়িক বিরোধে অনিরাপত্তার অভিযোগ থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হয়ে পড়েন।

একইভাবে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং দীর্ঘ আইনি জটিলতাও বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। রাজনৈতিক বা অন্যান্য অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাতে অকারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার

ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, কুৎসা বা চরিত্রহননের অভিযোগও ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি করছে। কোনো উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইনি প্রক্রিয়ায় তার তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ব্যবসায়িক আস্থা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অপপ্রচারের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উদ্যোক্তা মূল্যায়ন

অর্থনীতির স্বার্থে উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্বে তাদের অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

‘আমার লোক’ কিংবা ‘তোমার লোক’—এই ধরনের বিভাজন ব্যবসায়িক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বা উদ্যোক্তা দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের মাধ্যমে অবদান রাখলে তার ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই মূল্যায়ন করা উচিত।

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংক হিসাব

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা ক্রমেই বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও নতুন বাজার তৈরির জন্য উদ্যোক্তাদের বিদেশে যাতায়াত প্রয়োজন হয়।

কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্তের প্রয়োজন থাকলে তা অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। তবে দীর্ঘদিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা ব্যাংক হিসাব স্থগিত থাকলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট

শিল্প উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ অন্যতম পূর্বশর্ত। গ্যাস সংকট কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে কোনো কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু উদ্যোক্তার ওপর পড়ে না; শ্রমিক, সরবরাহকারী, ব্যাংক, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট পুরো অর্থনৈতিক চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো জরুরি

ব্যবসা শুরু, অনুমোদন গ্রহণ, জমি, ইউটিলিটি সংযোগ, কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এখনো উদ্যোক্তাদের বড় সমস্যাগুলোর একটি। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ব্যবসা সহজ করার নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে পুরোনো পদ্ধতি ও জটিলতা থেকে গেলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

একটি সিদ্ধান্ত তখনই কার্যকর হয়, যখন তা দ্রুত এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়। তাই প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সংকটে থাকা শিল্পকে পুনর্গঠনের সুযোগ

বিভিন্ন কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা বাজার সংকটের কারণে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানকে যাচাই-বাছাই করে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়া এবং কর্মসংস্থান রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কারণ একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে শুধু একজন উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন না; এর সঙ্গে শত শত বা হাজারো কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ে।

কর-ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কার

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় অবশ্যই জরুরি, তবে কর প্রশাসনের প্রক্রিয়া যেন বিনিয়োগ ও ব্যবসার পথে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ই সমাধান

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সরকার ও বেসরকারি খাতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকার নীতি, অবকাঠামো ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করবে; উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবেন।

বিশ্বের সফল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, সরকারকে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয় যেখানে উদ্যোক্তারা নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন।

এখন বাস্তবায়নের সময়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সহজ কর ব্যবস্থা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য আস্থাশীল পরিবেশ।

সরকারের অভ্যন্তরে যদি কোনো মহলের নিষ্ক্রিয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ভিন্নমুখী কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে তা চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

কারণ একটি কারখানা বন্ধ থাকা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা নয়—এর সঙ্গে যুক্ত থাকে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, ব্যাংকের ঋণ, সরবরাহকারীর ব্যবসা, সরকারের রাজস্ব এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। একইভাবে একজন উদ্যোক্তার আস্থা হারানো মানে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকি।

তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থের সংকট নয়; আস্থার সংকট, বাস্তবায়নের সংকট এবং নীতির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কাজের সমন্বয়ের সংকট।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন প্রয়োজন এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, উদ্যোক্তারা নিরাপদ বোধ করবেন এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—প্রধানমন্ত্রী যখন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছেন, তখন সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বাধা তৈরি করছে কারা? তাদের চিহ্নিত করা এবং যোগ্য, দক্ষ ও আন্তরিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement