ড্রোন ঠেকাতে মাছ ধরার জাল, পাকিস্তান পুলিশের অভিনব কৌশল

ড্রোন ঠেকাতে মাছ ধরার জাল, পাকিস্তান পুলিশের অভিনব কৌশল ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Published : ১১:৪৩, ৭ অক্টোবর ২০২৬

ড্রোনে বিস্ফোরক বহন করে হামলা এখন পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নতুন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আফগানিস্তান সীমান্তঘেঁষা খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে পুলিশ চেকপোস্ট ও নিরাপত্তা স্থাপনাগুলোতে এ ধরনের হামলার ঝুঁকি বাড়ছে। সীমিত অর্থ ও সরঞ্জামের মধ্যে হামলা মোকাবিলায় স্থানীয় পুলিশ তাই বেছে নিয়েছে তুলনামূলক কম খরচের এক পদ্ধতি—চেকপোস্টের মাথার ওপর মাছ ধরার জাল টাঙানো।

হাঙ্গু জেলার সারকি পিয়ালা পুলিশ চেকপোস্টে গত ১৬ এপ্রিল বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলার সময় পুলিশ পরিদর্শক ফায়াজ খান ও তাঁর সহকর্মীরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আফগান সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের ওই চেকপোস্টে হামলার পাশাপাশি চারদিক থেকে গুলিও চালানো হয়। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) পরে হামলার দায় স্বীকার করে।

ফায়াজ খান জানান, প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলেছিল। এতে একটি সাঁজোয়া যানের চালক নিহত এবং এক পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই সময় তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন বলেও জানান তিনি।

পরবর্তী সময়ে সারকি পিয়ালা চেকপোস্টের ওপর কয়েক মিটার উচ্চতায় কালো মাছ ধরার জাল বসানো হয়। পুলিশ বলছে, প্রায় দুই মাস আগে এই ব্যবস্থা চালুর পর থেকে ওই চেকপোস্টে আর কোনো ড্রোন হামলা হয়নি। পুলিশের ধারণা, উড়ে আসা কোনো ড্রোন জালে আটকে গেলে সেটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারবে না। আবার জালের ওপরে বিস্ফোরণ ঘটলেও বিস্ফোরণের চাপ ও ধাতব টুকরোর আঘাত কিছুটা কমতে পারে।

হাঙ্গুর পুলিশ কর্মকর্তা তারিক হাবিব জানান, প্রায় চার লাখ পাকিস্তানি রুপি বা ১ হাজার ৪৩৫ মার্কিন ডলারে একটি সাধারণ চেকপোস্ট এ ধরনের জাল দিয়ে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। ঝুঁকিপূর্ণ থানা ও চেকপোস্টগুলোতে ধাপে ধাপে এই ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এ কর্মসূচি আরও বাড়াতে প্রাদেশিক সরকারের কাছে অতিরিক্ত অর্থও চেয়েছে হাঙ্গু পুলিশ।

খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের মুখপাত্র আব্দুল সালাম খালিদ জানান, কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খানসহ অন্তত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় পুলিশ পোস্ট ও চেকপয়েন্টে একই ধরনের জাল বসানো হয়েছে। কিছু এলাকায় সামরিক চৌকিতেও ড্রোন-প্রতিরোধী জাল ব্যবহার করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার ধরনও বদলেছে। আগ্নেয়াস্ত্র ও মর্টারের পাশাপাশি হামলায় ড্রোন ও কোয়াডকপ্টারের ব্যবহার বাড়ছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসব হামলার অন্যতম লক্ষ্য। পাকিস্তান সরকার দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানে থাকা টিটিপির নিরাপদ আশ্রয়ের অভিযোগ তুললেও কাবুল তা অস্বীকার করে আসছে।

হাঙ্গুতে গত ২৯ জুলাই একটি পুলিশ ফাঁড়িতে বোমা-যুক্ত কোয়াডকপ্টার হামলার পর স্থল হামলাও চালানো হয়। এতে অন্তত ১১ পুলিশ সদস্য নিহত ও ২৮ জন আহত হন। দীর্ঘ ওই সংঘর্ষে ১৫ হামলাকারীও নিহত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চলতি বছর হাঙ্গুতে অন্তত ১৬টি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে বলে পুলিশের তথ্য।

পুলিশ কর্মকর্তা জিশান খান বলেন, জাল বসানোর পর সারকি পিয়ালা ও কাছের বালিয়ামেনা চেকপোস্টে আর কোনো ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার হামলা হয়নি। তাঁর মতে, এটি পুলিশ সদস্যদের জন্য ‘নিরাপত্তার একটি বাড়তি স্তর’ তৈরি করেছে এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই দাবির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইসলামাবাদভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুলের মতে, নির্দিষ্ট চেকপোস্টে জাল বসানো একটি সীমিত ও কম খরচের ব্যবস্থা হলেও সব ধরনের ড্রোন হামলা ঠেকাতে এটি যথেষ্ট নাও হতে পারে। কারণ হামলাকারীরা সবসময় পুলিশ চেকপোস্টকেই লক্ষ্য করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফিদা আদিল বলেন, সামরিক বাহিনীর ক্যামোফ্লেজ নেট ব্যবহারের ধারণা থেকেই মাছ ধরার জাল ব্যবহারের কৌশল এসেছে। ইউক্রেনেও রুশ ড্রোন মোকাবিলায় এ ধরনের জাল ব্যবহারের নজির রয়েছে। তবে বিস্ফোরকবাহী ড্রোনের বিরুদ্ধে জাল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে জালের নকশা, উচ্চতা ও স্থাপনের পদ্ধতির ওপর। পুলিশের দাবি করা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সুরক্ষার হিসাব নিশ্চিত করতে আরও বাস্তব পরীক্ষা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পুলিশ অবশ্য জানায়, কোহাট এলাকায় এ পদ্ধতির একটি পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পরীক্ষায় জালের ওপর বিস্ফোরক ফেলা হলেও সেটি বিস্ফোরিত হয়নি।

ফায়াজ খানও স্বীকার করেন, মাথার ওপর মাছ ধরার জাল টাঙানো কোনো পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সময় এটি তাঁকে ও তাঁর সহকর্মীদের কিছুটা নিরাপত্তার অনুভূতি দিচ্ছে। তাঁর মতে, হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে না পারলেও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এই সস্তা ব্যবস্থা কিছুটা কাজে আসতে পারে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement