জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক আন্দোলনের নতুন বাস্তবতায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রভাব
Published : ২৩:০১, ৬ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী এমন এক সময়ে পালন করছে বাংলাদেশ, যখন দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের ধরন ও কৌশলে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় জনসমুদ্রভরা মিছিল ও সমাবেশ ছিল রাজনৈতিক শক্তির প্রধান প্রকাশভঙ্গি। এখন একটি স্মার্টফোন, একটি লাইভ সম্প্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছাত্র ও তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পেছনে ছিল বাস্তব সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ। তবে এসব আন্দোলনের বিস্তার, গতি এবং জনসম্পৃক্ততা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সেগুলোর অ্যালগরিদম।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন সময়ের সঙ্গে সহিংসতা, রাজনৈতিক সংকট ও জনঅসন্তোষের প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত হয়। একইভাবে ভারতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং নেপালে দুর্নীতিবিরোধী তরুণদের বিক্ষোভও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আন্দোলনের কারণ তৈরি না করলেও তথ্যপ্রবাহের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আগে একটি আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগলেও এখন একটি ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বা একটি ভাইরাল হ্যাশট্যাগ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয়, যা মানুষের আবেগ—বিশেষ করে ক্ষোভ, ভয় বা আশার অনুভূতি—তীব্রভাবে উদ্দীপিত করে। ফলে প্রেক্ষাপটনির্ভর বিশ্লেষণের তুলনায় আবেগনির্ভর তথ্য দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই বাস্তবতার ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় দিকই সামনে এনেছে। একদিকে নাগরিকরা ঘটনাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নথিবদ্ধ ও প্রচারের সুযোগ পেয়েছেন, অন্যদিকে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জনমতকে প্রভাবিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ডিজিটাল অ্যালগরিদম কি রাজনৈতিক সংগঠিতকরণকে ত্বরান্বিত করছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ইস্যুর ব্যাপক উপস্থিতি কি প্রকৃত জনসমর্থনের প্রতিফলন, নাকি প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমিক নকশা কিছু বিষয়কে অন্যগুলোর তুলনায় বেশি দৃশ্যমান করে?
তারা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। আন্দোলন জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রকে টেকসই করতে প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা।
বিশ্লেষকদের মতে, অ্যালগরিদমনির্ভর রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অ্যালগরিদমে অধিক স্বচ্ছতা, স্বাধীন নজরদারি, নাগরিকদের ডিজিটাল ও গণমাধ্যম-সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং তথ্য-প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি আন্দোলন পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, তবে সেই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব নির্ভর করে জনগণের আস্থা অর্জন ও ধরে রাখতে সক্ষম শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর।

































