বিদেশে অর্থপাচার ও পারিবারিক সিন্ডিকেটের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতের পুরোনো সংকট নিয়ে প্রশ্ন
Published : ০১:৪১, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবনে ভোগান্তি বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হচ্ছে না—এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কম ব্যবহার, আর্থিক চাপ এবং অতীতের নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবকে বর্তমান সংকটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাগজে-কলমে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। তারপরও বিভিন্ন সময়ে প্রকৃত উৎপাদন ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে নেমে আসায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন না হওয়াই সংকটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বড় অংশের বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসনির্ভর। পূর্ণ সক্ষমতায় এসব কেন্দ্র পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন হলেও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কেন্দ্র কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদন করতে পারছে না।
একই সঙ্গে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকট বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও জ্বালানি সংগ্রহ এবং বকেয়া পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধে বিলম্ব হলে জ্বালানি কেনা ও নিয়মিত উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এবং বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় অতীতে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে কুইক রেন্টালসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রগুলোর ব্যয়, বিদ্যুৎ ক্রয় এবং ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার জন্য অর্থ পরিশোধের চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিভিন্ন প্রকল্প, দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কিছু প্রকল্পে স্বচ্ছতা, দরপত্র প্রক্রিয়া, ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বার্থের সংঘাত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।
সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদকে ঘিরেও বিভিন্ন প্রকল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে অনিয়ম এবং স্বার্থসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠদের নিয়ে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠারও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোই স্বাধীনভাবে প্রমাণিত বা আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন তথ্য এখানে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
প্রিপেইড মিটার, আইটি অবকাঠামো, সৌরবিদ্যুৎ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও অতীতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মাল্টা ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে বিদেশে অর্থপাচার বা সম্পদ অর্জনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের নথি, আর্থিক লেনদেন, মালিকানা কাঠামো এবং আইনগত তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন। অভিযোগ ও তদন্তের তথ্যকে তাই প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন না করে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতি শুধু উৎপাদন সক্ষমতার সংকট নয়; এর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো এবং অতীতের নীতিগত সিদ্ধান্তও জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর দক্ষতা উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন-বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।
একই সঙ্গে অতীতের বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয়, চুক্তি, ক্যাপাসিটি চার্জ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য অনিয়ম স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপের প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।
বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে তাই অতীতের সিদ্ধান্তের মূল্যায়নের পাশাপাশি বাস্তব চাহিদাভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা, জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
































