নব্বইয়ের দশকের বলিউডে প্রেমের গল্প: কোনটি সত্যি, কোনটি ছিল গুঞ্জন?
Published : ১৯:৫৩, ১৩ আগস্ট ২০২৬
নব্বইয়ের দশকের বলিউড মানেই একঝাঁক তারকা, জনপ্রিয় সিনেমা আর তাঁদের ঘিরে অসংখ্য গল্প। শাহরুখ খান, সালমান খান, আমির খান, অক্ষয় কুমার, অজয় দেবগন, সঞ্জয় দত্ত, গোবিন্দ, মাধুরী দীক্ষিত, কাজল, কারিশমা কাপুর, রাভিনা ট্যান্ডন, শিল্পা শেঠি, নীলম কোঠারি ও পূজা ভাট—পর্দার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন নিয়েও ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে।
তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। তারকাদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ভক্তদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগও ছিল সীমিত। ফলে ফিল্ম ম্যাগাজিন, ট্যাবলয়েড ও গসিপ কলামই ছিল তারকাদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে আলোচনার বড় মাধ্যম। সহশিল্পীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কিংবা পর্দায় দারুণ রসায়ন থেকেই অনেক সময় তৈরি হতো প্রেমের গুঞ্জন।
কিছু সম্পর্ক সত্যিই প্রেমে রূপ নিয়েছিল, কিছু বাগ্দান বা বিয়ের পর্যায়ে গিয়েছিল, আবার কিছু শেষ পর্যন্ত থেকে গেছে গুঞ্জন হিসেবেই।
গোবিন্দ-নীলম: বন্ধুত্বের আড়ালে কি ছিল প্রেম?
গোবিন্দ ও নীলম কোঠারির জুটি নব্বইয়ের দশকের আগেই দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ‘ইলজাম’, ‘লাভ ৮৬’, ‘খুদগর্জ’ ও ‘গর কা চিরাগ’-এর মতো সিনেমায় তাঁদের একসঙ্গে দেখা যায়।
তাঁদের পর্দার রসায়ন থেকেই বাস্তব জীবনে প্রেমের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই গল্পের বিশেষ দিক হলো, গোবিন্দ নিজেই নীলমের প্রতি নিজের আকর্ষণের কথা জানিয়েছিলেন।
১৯৯০ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি নীলমকে পছন্দ করার কথা বলেন এবং জানান, একসময় তাঁকে বিয়ে করার কথাও ভেবেছিলেন। এমনকি বর্তমান স্ত্রী সুনীতার সঙ্গে তাঁর বাগ্দান ভেঙে নীলমকে বিয়ে করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তবে নীলম পরবর্তীতে তাঁদের প্রেমের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন। ফলে এই সম্পর্ককে দুজনের স্বীকৃত প্রেমের চেয়ে গোবিন্দের একতরফা আকর্ষণ ও ঘনিষ্ঠতার গল্প হিসেবেই দেখা নিরাপদ।
অক্ষয়-রাভিনা: বাগ্দান পর্যন্ত গিয়েছিল সম্পর্ক।
নব্বইয়ের দশকের আলোচিত প্রেমের গল্পে অক্ষয় কুমার ও রাভিনা ট্যান্ডনের নাম অন্যতম। ‘মোহরা’ সিনেমায় তাঁদের জুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পর্দার রসায়ন ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের সম্পর্কের গুঞ্জনেও রূপ নেয়।
পরবর্তীতে রাভিনা জানিয়েছেন, তাঁদের সম্পর্ক বাগ্দান পর্যন্ত গিয়েছিল। অক্ষয়ও স্বীকার করেছিলেন যে তাঁদের বাগ্দান হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয়নি।
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর দুজনই নিজেদের জীবনে এগিয়ে যান। সময়ের সঙ্গে পুরোনো সেই সম্পর্কও অতীতের অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
অক্ষয়-শিল্পা: প্রেম থেকে তিক্ত বিচ্ছেদ।
অক্ষয় কুমার ও শিল্পা শেঠির সম্পর্কও ছিল নব্বইয়ের দশকের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ‘ম্যায় খিলাড়ি তু আনাড়ি’সহ কয়েকটি সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করার সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
তবে সম্পর্কের শেষটা ছিল তিক্ত। ২০০০ সালে বিচ্ছেদের পর শিল্পা অক্ষয়ের বিরুদ্ধে তাঁকে প্রতারণা করার অভিযোগ আনেন। তাঁর দাবি ছিল, সম্পর্ক চলাকালীন অক্ষয় অন্য একজনের সঙ্গেও সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।
পরে অক্ষয়ের সঙ্গে টুইঙ্কল খান্নার সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে। ২০০১ সালে তাঁরা বিয়ে করেন।
অক্ষয়-শিল্পার সম্পর্ক তাই নিছক গুঞ্জন ছিল না; তবে সম্পর্ক ভাঙার কারণ নিয়ে দুজনের বক্তব্যে পার্থক্য ছিল।
অজয় দেবগন-কারিশমা কাপুর: গুঞ্জনেই সীমাবদ্ধ।
অজয় দেবগন ও কারিশমা কাপুর একাধিক সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। ‘জিগর’ ও ‘শক্তিমান’-এর মতো সিনেমায় তাঁদের জুটি দেখা যায়।
তাঁদের ঘনিষ্ঠতা থেকেই প্রেমের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি বিয়ের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ১৯৯৩ সালে কারিশমা এক সাক্ষাৎকারে এসব খবর অস্বীকার করে জানিয়েছিলেন, তাঁরা শুধুই বন্ধু।
পরবর্তীতে অজয়ের জীবনে কাজল আসেন। কারিশমাও নিজের জীবনে এগিয়ে যান। ফলে এই সম্পর্কটি মূলত নব্বইয়ের দশকের আলোচিত গসিপ হিসেবেই থেকে যায়।
অজয়-কাজল: গুঞ্জন থেকে সংসার।
নব্বইয়ের দশকের সব প্রেমের গল্প যে গুঞ্জন ছিল না, তার বড় উদাহরণ অজয় দেবগন ও কাজল।
১৯৯৪ সালের দিকে তাঁদের সম্পর্ক শুরু হয়। দুজনের ব্যক্তিত্বে পার্থক্য থাকলেও ধীরে ধীরে তাঁদের সম্পর্ক গভীর হয়। প্রায় চার বছর প্রেমের পর ১৯৯৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তাঁরা বিয়ে করেন।
গণমাধ্যমের নজর এড়াতে তাঁদের বিয়ের আয়োজনও বেশ গোপনীয় রাখা হয়েছিল।
আজও বলিউডের অন্যতম স্থায়ী তারকা দম্পতি হিসেবে পরিচিত অজয়-কাজল।
সঞ্জয় দত্ত-মাধুরী দীক্ষিত: রহস্যময় প্রেমের গুঞ্জন।
সঞ্জয় দত্ত ও মাধুরী দীক্ষিতের কথিত প্রেম ছিল নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে আলোচিত গুঞ্জনগুলোর একটি।
‘সাজন’ ও ‘খলনায়ক’-এর মতো সিনেমায় তাঁদের পর্দার রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করে। এরপর তাঁদের প্রেম এমনকি বিয়ের সম্ভাবনা নিয়েও বিভিন্ন ম্যাগাজিনে খবর প্রকাশিত হতে থাকে।
তবে দুজনেই সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছিলেন। সঞ্জয়ও পরবর্তীতে জানান, মাধুরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল পেশাগত ও বন্ধুত্বপূর্ণ।
ফলে এই সম্পর্কের সত্যতা নিশ্চিত করার মতো প্রকাশ্য স্বীকৃতি না থাকায় এটি আজও বলিউডের রহস্যময় প্রেমের গুঞ্জনগুলোর একটি।
আমির খান-পূজা ভাট: পর্দার রসায়ন, নাকি আরও কিছু?
১৯৯১ সালের ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’ সিনেমায় আমির খান ও পূজা ভাটের জুটি দর্শকদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে।
সিনেমার শুটিংয়ের সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রেমের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। বহু বছর পর পূজা ভাটও জানিয়েছেন, শুটিংয়ের সময় তাঁদের মধ্যে একটি বিশেষ রসায়ন বা ‘স্পার্ক’ ছিল।
তবে সেই অনুভূতি বাস্তব প্রেমের সম্পর্কে গড়ায়নি। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সম্পর্কটি প্রেমের পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলেই পূজার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
সালমান খান-ঐশ্বরিয়া রাই: সবচেয়ে আলোচিত প্রেম?
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে সালমান খান ও ঐশ্বরিয়া রাইয়ের সম্পর্ক ছিল বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি।
১৯৯৯ সালের ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করার সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এরপর প্রেমের সম্পর্কের খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সম্পর্কটি প্রায় তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল।
তবে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অনেক তথ্যই ছিল সূত্রনির্ভর। বিচ্ছেদের পর ঐশ্বরিয়া প্রকাশ্যে সালমানের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন এবং গুরুতর অভিযোগ তোলেন।
সম্পর্কের শুরু নব্বইয়ের দশকে হলেও এর শেষ অধ্যায় গড়ায় ২০০২ সালে। তাই নব্বইয়ের দশকের বলিউডের প্রেমের ইতিহাসে সালমান-ঐশ্বরিয়ার নাম আলাদা গুরুত্ব পায়।
কেন এত জনপ্রিয় ছিল নব্বইয়ের দশকের প্রেমের গল্প?
আজকের দিনে কোনো তারকা কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে দেখা করলেন কিংবা কী করলেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে মুহূর্তেই তা ভক্তদের সামনে চলে আসে।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারকাদের ব্যক্তিজীবন ছিল অনেক বেশি আড়ালে। ফলে শুটিং সেটে কার সঙ্গে কে বেশি সময় কাটালেন, কার জন্মদিনে কে গেলেন কিংবা কোন সহশিল্পীর সঙ্গে কার রসায়ন বেশি—এসবই হয়ে উঠত খবরের বিষয়।
ফিল্ম ম্যাগাজিন ও গসিপ কলামগুলোও এসব খবরকে কেন্দ্র করে নিয়মিত কভার স্টোরি প্রকাশ করত। ফলে কোনো সম্পর্কের গুঞ্জন একবার শুরু হলে তা নিয়ে একের পর এক গল্প তৈরি হতো।
কখনো সেই গুঞ্জনের পেছনে সত্যিকারের প্রেম ছিল, কখনো ছিল বন্ধুত্ব, আবার কখনো ছিল শুধুই পর্দার রসায়ন।

































