‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার: বাংলাদেশের রাজনীতিতে মানদণ্ডের প্রশ্ন

‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার: বাংলাদেশের রাজনীতিতে মানদণ্ডের প্রশ্ন ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ২১:১৩, ১৩ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটির ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতারা প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক আচরণ, ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবস্থান নিয়ে নানা অভিযোগ তুলছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দল বা সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আবেগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে নির্দিষ্ট আচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান ও বাস্তব কর্মকাণ্ডকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় বিশেষ করে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী প্রবণতা ও ফ্যাসিবাদী রাজনীতির আশঙ্কার কথা বলেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাদের বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিরোধী মত, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

তবে কোনো নির্বাচিত সরকারই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালনা করছে, বিরোধী মত ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করছে, নির্বাচন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ও স্বাধীন থাকছে—এসব বিষয়ই একটি সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্র মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। একটি দল অন্য দলের রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুললে সেই দলের নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাস, সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও বর্তমান অবস্থান নিয়েও জনপরিসরে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাসও আলোচনায় আসে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায়। স্বাধীনতার বিরোধিতার পাশাপাশি দলটির কয়েকজন নেতার ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিচার ও রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। বর্তমান সময়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুনভাবে তুলে ধরলেও অতীতের এসব বিষয় নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

একইভাবে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মকাণ্ড নিয়েও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক ও সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করতে হলে নির্দিষ্ট ঘটনা, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নারীর অধিকার, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং বহুত্ববাদী সমাজে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আধুনিক গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘুদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করতে গিয়ে তার প্রত্যেক নেতা, কর্মী বা সমর্থককে একইভাবে চিহ্নিত করা যুক্তিসংগত নয়। রাজনৈতিক দলকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দলীয় নীতি, নেতৃত্বের বক্তব্য, সাংগঠনিক আচরণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সম্ভাব্য নীতিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটিরও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অর্থ রয়েছে। সাধারণভাবে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, রাজনৈতিক আধিপত্য, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, বিরোধীদের দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ক্ষমতার অধীন করার প্রবণতার সঙ্গে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির ধারণা যুক্ত করা হয়।

তাই কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারকে এই শব্দে চিহ্নিত করার আগে তার বাস্তব রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করা জরুরি। শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় শব্দটির পুনরাবৃত্তি হলে এর বিশ্লেষণাত্মক গুরুত্ব কমে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বিএনপির ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। সরকার হিসেবে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে আচরণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার বিষয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

একইভাবে এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডও জনগণের মূল্যায়নের আওতায় থাকবে। জুলাইয়ের আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী দল হিসেবে তাদের কাছ থেকেও গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদের প্রতি সুস্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কে কাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলছে, তা নয়; বরং কোন রাজনৈতিক দল কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করছে, ভিন্নমতকে কতটা সম্মান করছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কতটা স্বাধীন রাখছে এবং নাগরিকদের সমান অধিকার কতটা নিশ্চিত করছে।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একই মানদণ্ড সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপিকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য, জামায়াতে ইসলামীকে তার ইতিহাস ও বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য এবং এনসিপিকে তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ ভূমিকার জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় শুধু তার ব্যবহৃত রাজনৈতিক শব্দ বা স্লোগানে নির্ধারিত হয় না। জনগণ একটি দলের প্রকৃত চরিত্র মূল্যায়ন করে তার নীতি, আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য তাই রাজনৈতিক বিতর্কে ব্যক্তিগত বা দলীয় বিশেষণের পরিবর্তে তথ্য, প্রমাণ, ইতিহাস ও বাস্তব কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়াই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement