পদ্মা ব্যারাজে বদলে যেতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪ জেলার অর্থনীতি ও কৃষি

পদ্মা ব্যারাজে বদলে যেতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪ জেলার অর্থনীতি ও কৃষি ছবি : সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেক্স

Published : ১২:৪৪, ২০ জুন ২০২৬

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট, নদীভাঙন ও সেচ সমস্যার সমাধানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদী ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির কাজ ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ২৪টি জেলার ১৬১টি উপজেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বাসসকে বলেন, পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি নদীকেন্দ্রিক প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বৃহৎ উন্নয়ন উদ্যোগ।

তিনি বলেন, “নদীর নাব্যতা সংকট, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব এবং সীমিত ব্যবস্থাপনার কারণে এ অঞ্চলের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিবর্তন আসবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের মাধ্যমে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের ফলে দুই লাখ হেক্টরের বেশি এক ফসলি জমি দুই ফসলি এবং এক লাখ হেক্টরের বেশি জমি তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা সমস্যা কমে কৃষকের কাছে মিঠা পানির সরবরাহ নিশ্চিত হলে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।

কৃষি গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বোরো ধানের গড় উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ টন হলেও উন্নত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে তা ৬ থেকে ৭ টনে উন্নীত করা সম্ভব। একইভাবে গম, ভুট্টা ও আলুর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, পদ্মা পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রকল্প এটি। এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা হবে।

পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মা নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রতিবছর নদীভাঙনের কারণে হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত ড্রেজিং, নদীতীর সংরক্ষণ এবং আধুনিক প্রবাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

তাদের মতে, অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এক হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে এক থেকে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কৃষকের আয় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য কমবে এবং কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement