অর্থনীতি ও উন্নয়নের বার্তা নিয়ে জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমান

অর্থনীতি ও উন্নয়নের বার্তা নিয়ে জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি

Published : ১৯:০৫, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বার্তা নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২১ সেপ্টেম্বর তাঁর নিউইয়র্ক যাওয়ার কথা রয়েছে এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেবেন। ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ছোট একটি প্রতিনিধি দল থাকছে। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All।” এবারের অধিবেশনে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং চলমান বিভিন্ন সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

অর্থনীতি ও বিনিয়োগে গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রীর এবারের বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

বাংলাদেশ বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো একাধিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশের তুলনায় কিছুটা কম এবং গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও আগস্টে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমেছে। তবে একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে।

ফলে মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, ক্রয়ক্ষমতা এবং বাজারদর বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে রয়েছে।

জ্বালানি ও শিল্পখাত

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। গ্যাসের সরবরাহ, এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ—এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

শিল্পখাতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে স্থিতিশীল নীতিমালা, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে।

বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।

এসব বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরও একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জুন ২০২৬ সালে সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে এ সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ এবং মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায্য অংশীদারিত্বের মতো বিষয়গুলোও তুলে ধরতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ

নিউইয়র্ক সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন বলে জানানো হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর এ অনুষ্ঠানে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

জাতিসংঘের অধিবেশনের পাশাপাশি এ ধরনের আনুষ্ঠানিক ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক বার্তা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য বাংলাদেশের নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রথম বড় উপস্থাপনাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এই সফরের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্য রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতিসংঘের মঞ্চে তাই বাংলাদেশের বক্তব্যে উন্নয়ন, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই সফর বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং বৈশ্বিক অংশীদারদের সামনে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement