কামাল ট্রেডিং থেকে এমজিআই: এক শিল্প উদ্যোক্তার অর্ধশতকের রূপকথা!

কামাল ট্রেডিং থেকে এমজিআই: এক শিল্প উদ্যোক্তার অর্ধশতকের রূপকথা! ফাইল ছবি

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৯:৪৮, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাড়ার মুদির দোকানের শেলফে ‘ফ্রেশ’ ব্র্যান্ডের পণ্য, রান্নাঘরে সয়াবিন তেল, লবণ ও চিনি, অফিসের টেবিলে ফ্রেশ পেপার, শিশুর যত্নে হ্যাপি ন্যাপি—দৈনন্দিন জীবনের নানা পণ্যের পাশাপাশি সিমেন্ট, স্টিল, কেমিক্যাল, এলপিজি, বিদ্যুৎ, শিপিং কিংবা শিল্পের কাঁচামালেও রয়েছে একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উপস্থিতি। প্রতিষ্ঠানটি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (MGI)।

বর্তমানে এমজিআই ৫৭টির বেশি শিল্প ইউনিট পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, গ্রুপটিতে কাজ করছেন ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ; রয়েছে ৬ হাজার ৬৫০ পরিবেশক ও ২০ হাজার সরবরাহকারী। বিশ্বের ৫২টি দেশে রপ্তানি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু এই বিশাল শিল্পগোষ্ঠীর শুরুটা ছিল খুবই ছোট পরিসরে। ১৯৭৬ সালে প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা মূলধন নিয়ে মোস্তফা কামাল শুরু করেন ‘কামাল ট্রেডিং কোম্পানি’। প্রায় ১৩ বছর পর, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ। ১৯৯৩ সালের দিকে দুগ্ধ ও খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে বাজারে আসে ‘ফ্রেশ’ ব্র্যান্ড।

পুঁজি ছিল মাত্র ৬৫০ টাকা
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের ব্যবসায়িক যাত্রার শুরু ছিল ট্রেডিং দিয়ে। ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৬ সালে তাঁর মূলধন ছিল আনুমানিক ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ টাকা জমি বন্ধক রেখে ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল বলে মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন।

১৯৮৯ সালে প্রথম কারখানা স্থাপনের পর ব্যবসার পরিধি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মূল ব্যবসার প্রয়োজন থেকেই নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগের ধারণা তৈরি হয়। পণ্য বাজারজাত করতে কার্টন প্রয়োজন হলে প্যাকেজিং, কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের জন্য শিপিং—এভাবে ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধাপে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলতে থাকে এমজিআই।

মোস্তফা কামাল দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কার্টন, ড্রাম ও শিপিংয়ের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এসব খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের চিন্তা আসে।

এই কৌশলকে ব্যবসায়িক ভাষায় ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড ইন্টিগ্রেশন বলা যায়। অর্থাৎ, একটি পণ্যের উৎপাদন থেকে কাঁচামাল, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ—বিভিন্ন ধাপকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা।

এক ব্যবসা থেকে বহু শিল্প
এমজিআইয়ের প্রবৃদ্ধির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বৈচিত্র্যকরণ। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি আটটি এবং ২০২০ সালে আরও নয়টি শিল্প ইউনিট স্থাপন করে। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও বিনিয়োগ অব্যাহত রেখে ২০২০ সালে প্রায় ৪৫১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নয়টি নতুন শিল্প ইউনিট স্থাপনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

বর্তমানে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস, কেমিক্যালস, জ্বালানি, কাগজ, স্বাস্থ্য ও হাইজিন, শিপিং, এভিয়েশন, বিদ্যুৎ, অর্থনীতি ও আর্থিক সেবা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিপবিল্ডিংসহ বিস্তৃত খাতে এমজিআইয়ের ব্যবসা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের ব্যবসা ৫৭টির বেশি ভার্টিক্যালে বিস্তৃত।

এমজিআইয়ের চারটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলও রয়েছে—মেঘনা ইকোনমিক জোন, মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন, কুমিল্লা ইকোনমিক জোন ও তিতাস ইকোনমিক জোন।

‘ফ্রেশ’ থেকে ব্র্যান্ড সাম্রাজ্য
এমজিআইয়ের ভোক্তা পর্যায়ের সবচেয়ে পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর একটি ‘ফ্রেশ’। খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এই ব্র্যান্ডের উপস্থিতি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফ্রেশ ব্র্যান্ডকে আস্থা ও গুণমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

ফ্রেশ ব্র্যান্ডের অধীনে ভোজ্যতেল, চাল, আটা-ময়দা, লবণ, চিনি, ডাল, মসলা, বিস্কুট, নুডলস, স্ন্যাকস, কনফেকশনারি, কাগজ ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও হাইজিন পণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে।

এভাবেই একটি পরিচিত ব্র্যান্ডের ওপর তৈরি হওয়া ভোক্তা আস্থাকে নতুন নতুন পণ্য ও ক্যাটাগরিতে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

৫০ বছরের পথ পেরিয়ে বৈশ্বিক বাজারে
২০২৪ সালে এমজিআইয়ের বার্ষিক টার্নওভার ৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছিল বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ৫৭টির বেশি শিল্প ইউনিটের পাশাপাশি ৬৫ হাজারের বেশি কর্মী, ৬ হাজার ৬৫০ পরিবেশক এবং ২০ হাজার সরবরাহকারী নিয়ে এর বিস্তৃত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক রয়েছে। বিশ্বের ৫২টি দেশে পণ্য রপ্তানি করছে এমজিআই।

এমজিআইয়ের রপ্তানি পোর্টফোলিওতে এফএমসিজি, কেমিক্যালস, বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস, শিপিং, এভিয়েশন, বিদ্যুৎ, সোলার, স্টিল, গ্লাস ও ফাইবার ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবা রয়েছে।

সংকটকে ব্যবসার সুযোগে রূপান্তর
মেঘনা গ্রুপের এই দীর্ঘ যাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রয়োজনকে নতুন ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা। কাঁচামাল সংগ্রহ, প্যাকেজিং, পরিবহন কিংবা শিল্প স্থাপনের জন্য অবকাঠামোগত প্রয়োজন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

মোস্তফা কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসার পথে কোনো সংকট দেখা দিলে সেটিকে শুধু সমস্যা হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ব্যবসার সুযোগ হিসেবেও দেখেছেন তিনি।

৬০০-৬৫০ টাকার মূলধন থেকে কয়েক দশকের ব্যবধানে ৩ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক টার্নওভার এবং ৫৭টির বেশি শিল্প ইউনিট—এমজিআইয়ের গল্প তাই শুধু একটি কোম্পানির সম্প্রসারণের ইতিহাস নয়। এটি একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, ব্যবসার বৈচিত্র্যকরণ, সরবরাহব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার একটি উদাহরণ।

মোস্তফা কামালের লক্ষ্য এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বিস্তৃত হওয়া। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিত্যনতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে মেঘনা গ্রুপকে আরও বড় বৈশ্বিক পরিসরে নিয়ে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য।

তথ্যসূত্র: InvestWiser

শেয়ার করুনঃ
Advertisement