চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের কেন্দ্রে বাংলাদেশ
Published : ১৯:৪২, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন একাধিক শক্তির অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত হচ্ছে, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ছে এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, পানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে—বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের নীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’। বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত—তিন দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন, স্বার্থ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র ভিন্ন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন পর্যালোচনা
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের পরিধি বিস্তৃত। ভৌগোলিক নৈকট্য, দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, নদীর পানি এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী অংশীদার।
সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে পূর্ববর্তী সময়ে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের পর্যালোচনায় চুক্তির আইনি কাঠামো, বাস্তবায়নের অগ্রগতি, অর্থনৈতিক ফলাফল, পারস্পরিক সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ দায় বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার ফলাফল যাই হোক, এটি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের বিভিন্ন কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করছে।
দুই দেশের সম্পর্কের সামনে পানি ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার বিষয়টি আগামী দিনের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি বাণিজ্য। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, সরবরাহশৃঙ্খল ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হচ্ছে।
২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে ‘Agreement on Reciprocal Trade’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির লক্ষ্য দুই দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ করা।
এর ফলে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাণিজ্যিক সুযোগের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও সরবরাহশৃঙ্খলে অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক পরিচালনায় বাংলাদেশের জন্য বাজার বৈচিত্র্য, রপ্তানি সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা
চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং অবকাঠামো সহযোগী। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চল, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ রয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং পানি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার আলোচনায় রয়েছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো ও বিনিয়োগের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানো, বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত করা এবং প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের কাছ থেকে আমদানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি কমানো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে। একই সঙ্গে বড় প্রকল্পের অর্থায়ন, ঋণের শর্ত, স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ও প্রকল্প মূল্যায়নের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
তিস্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য পানি, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে চীনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সম্ভাব্য সহযোগিতা যেমন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বড় কোনো আঞ্চলিক প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থায়ন ও প্রযুক্তির পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব, পরিচালন ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার সম্পর্কও ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরবরাহ ব্যবস্থা ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোও অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হয়ে উঠছে।
একই মাপকাঠিতে নয়, খাতভিত্তিক সম্পর্ক
চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একই ধরনের নয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। চীন অবকাঠামো, শিল্প ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারত প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, পানি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বাংলাদেশের জন্য তিন দেশের সম্পর্ককে একই মাপকাঠিতে না দেখে খাতভিত্তিক জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
যেখানে বাজার প্রয়োজন, সেখানে বাজার সম্প্রসারণ; যেখানে বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে বিনিয়োগ; যেখানে প্রযুক্তি প্রয়োজন, সেখানে প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল—এই পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও কার্যকর করতে পারে।
সামনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের পেছনে রয়েছে তার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বঙ্গোপসাগরীয় অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগের সুযোগ।
বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি বাইরে থাকতে পারবে না। তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগও বাংলাদেশের রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, স্বচ্ছ চুক্তি, প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বহুমুখীকরণ এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির মূল বিষয় তাই কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো পৃথক ক্ষেত্রগুলোকে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করা।
বহুমুখী কূটনীতি বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো ধারণা নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় এর প্রয়োজন আরও বেড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশ তার ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগাতে পারবে।


































