নোয়াখালীতে গান্ধীর ছাগল চুরি: গুজব নাকি সত্যি?

নোয়াখালীতে গান্ধীর ছাগল চুরি: গুজব নাকি সত্যি? ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৫:৩৫, ১৫ অক্টোবর ২০২৫

নোয়াখালীর নাম জড়িয়ে ‘গান্ধীর ছাগল চুরি’ বিষয়টি যুগ যুগ ধরে জনশ্রুতি ও স্থানীয় গল্পে উঠে এসেছে। সম্প্রতি এই বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, ইতিহাস ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে কোনো ছাগল চুরি করেননি। বিষয়টি মূলত একটি গুজব ও ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা।

নোয়াখালীর মাইজদী থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ ইউনিয়নে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট রয়েছে। এখানে মহাত্মা গান্ধীর বিশাল ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, গান্ধী এই জয়াগ গ্রামে আসার সময় তার ছাগল হারিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের ২৯ জানুয়ারি গান্ধী জয়াগে পৌঁছান এবং গ্রামের জমিদার হেমন্ত কুমার ঘোষের বাড়িতে থাকেন। পরবর্তীতে হেমন্ত কুমারের দান করা জমিতে গান্ধী ট্রাস্টসহ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা জানান, গান্ধী ১৯৪৬ সালে নোয়াখালী সফরে আসেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে। তাঁর সফরের সময় বা পরে কোনো দলিল, স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনীর কোনো সূত্রে ছাগল চুরির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গান্ধীর ব্যক্তিগত সহচরদের স্মৃতিচারণা এবং তার আত্মজীবনী ‘The Story of My Experiments with Truth’-তেও এর কোনো উল্লেখ নেই।

গান্ধী নোয়াখালীতে গ্রাম পরিদর্শন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। ১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতার দাঙ্গার প্রভাব নোয়াখালীতেও পড়ে, যেখানে হিন্দু-মুসলিম সহিংসতায় ২৮৫ জন নিহত হন এবং বহু ঘরবাড়ি পুড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে গান্ধী ৭ নভেম্বর নোয়াখালী আসেন এবং চার মাস ধরে ৪৭টি গ্রাম পরিদর্শন করে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করেন। জওহরলাল নেহরু, আবুল কালাম আজাদ ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতারাও এই শান্তি অভিযানে অংশ নেন।

গান্ধী কখনো গরু বা মহিষের দুধ পান করতেন না। তবে ১৯১৯ সালে মারাত্মক অসুস্থতার সময় চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি ছাগলের দুধ পান করতে বাধ্য হন। ১৯৩১ সালে লন্ডন সফরে ‘নির্মলা’ নামের একটি ছাগলও সঙ্গে ছিল। তবে নোয়াখালী সফরের সময় ছাগল চুরি বা এমন কোনো ঘটনা তার আত্মজীবনী বা সফরসঙ্গীদের দফতরীয় নথিতে নেই।

চাটখিল মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদ ফারুক সিদ্দিকী ফরহাদ জানান, “জনশ্রুতি যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে, কিন্তু ইতিহাস ও নথি বলে দেয় এটি এক প্রোপাগান্ডা মাত্র। এটি নোয়াখালী ও এখানকার মানুষের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়েছে।”

গান্ধী ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক মো. নুর নবী কালবেলা বলেন, “গান্ধীজির সফরসঙ্গীরা প্রতিদিনের কর্মসূচি দফতরীয়ভাবে লিখেছেন। যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটত, তা অবশ্যই নথিতে থাকত। জনশ্রুতি কেবল গালগল্প।”

তাহলে স্পষ্ট, নোয়াখালীতে মহাত্মা গান্ধীর ছাগল চুরি একটি গুজব। এটি ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টার অংশ মাত্র, যা বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement