৯০ শতাংশ ভাড়াটিয়ার তথ্য নেই, জঙ্গি আস্তানাসহ বাড়ছে খুন
Published : ১০:১০, ১৮ আগস্ট ২০২৬
ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে বাড়িওয়ালাদের কাছে ভাড়াটিয়াদের সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য না থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম বা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংরক্ষণ না করায় অপরাধী ও পলাতক আসামিদের সহজেই পরিচয় গোপন করে বাসা ভাড়া নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকায় একটি ভাড়া বাসা থেকে অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের পরিচয় শনাক্ত করতে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। পুলিশ জানায়, বাড়িওয়ালা নিহত ব্যক্তির কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এমনকি তার সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তির ফোন নম্বরও সংরক্ষণ করা হয়নি।
এর মাত্র দুদিন আগে জামগড়া এলাকায় অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাতেও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয় পুলিশ। ভাড়াটিয়ার কোনো তথ্য না থাকায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের বেগ পেতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাভার ও আশুলিয়ায় বসবাসকারী প্রায় ৪০ লাখ মানুষের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ভাড়াটিয়ার তথ্য প্রশাসনের কাছে নেই। স্থানীয়দের মতে, এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভাড়াটিয়ার সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষিত নেই।
বিশেষ করে ব্যাচেলর বাসাগুলোতে নামমাত্র ফোন নম্বর বা পরিচিত ব্যক্তির সূত্রে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। অনেক বাড়িওয়ালা ঝামেলা এড়াতে কিংবা দ্রুত ভাড়াটিয়া পরিবর্তনের কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পূর্ণাঙ্গ ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম সংগ্রহ করছেন না। ফলে অপরাধ সংঘটনের পর আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাড়তি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক রাশেদুজ্জামান বলেন, জামগড়া থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর তার পরিচয় নিশ্চিত করতে পুলিশের সময় লেগেছে। বাড়িওয়ালা কোনো মোবাইল নম্বরও সংরক্ষণ করেননি। তাঁর মতে, ভাড়াটিয়ার অন্তত একটি সচল ফোন নম্বর থাকলেও দ্রুত পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হতো।
শুধু সাধারণ অপরাধ নয়, ভুয়া পরিচয়ে জঙ্গিদের আস্তানা গড়ে তোলার ঘটনাও সামনে এসেছে। সাভারের হেমায়েতপুরে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির একটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে আরিফ নামে এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে পাইপ বোমা, গানপাউডার, সায়ানাইডসহ বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। বাড়ির মালিকের তথ্য অনুযায়ী, আরিফ চলতি মাসের ২ আগস্ট পরিবার নিয়ে থাকার কথা বলে ভুয়া পরিচয়ে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামিদেরও সাভার-আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তারের একাধিক ঘটনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ভাড়াটিয়াদের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে অপরাধী শনাক্ত ও তদন্ত কার্যক্রম আরও দ্রুত করা সম্ভব।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান জানান, ঢাকা জেলাজুড়ে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য অনলাইনভিত্তিক সেলফ-রেজিস্ট্রেশন ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ নিজেদের উদ্যোগেও এ কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মুরশেদ বলেন, অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হলেও অপরাধ তদন্তে ভাড়াটিয়া ফরম ও পরিচয়পত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য সংরক্ষিত থাকলে অপরাধের রহস্য উদঘাটন ও অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সহজ হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ সাভার-আশুলিয়ায় বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণে কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি। এতে শুধু অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণ নয়, অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সহজ হবে।

































