ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পিরোজপুরে জনজীবন বিপর্যস্ত, বরফকলের কোটি টাকার ব্যবসায় ধস
Published : ১১:১০, ১৮ আগস্ট ২০২৬
পিরোজপুরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে পাড়েরহাট মৎস্য বন্দরের বরফকলগুলো। সময়মতো বরফ না পাওয়ায় ইলিশের ভরা মৌসুমেও অনেক ট্রলার সাগরে পাঠাতে পারছেন না মালিকরা। এতে জেলে, বরফকল শ্রমিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি জেলার মৎস্যনির্ভর অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পাড়েরহাট মৎস্য বন্দরে একসময় ১০টি বরফকল চালু থাকলেও নানা সমস্যায় বর্তমানে টিকে আছে মাত্র দুটি। এগুলো হলো—দীপ্তি চৈতী আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ ও রমনা আইস প্ল্যান্ট। দুটি বরফকলে মালিক-শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মরত রয়েছেন।
বরফকল মালিকদের দাবি, সাম্প্রতিক তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে গত ১০ থেকে ১২ দিনে তাদের প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বরফ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। আবার উৎপাদিত বরফও সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রমনা আইস প্ল্যান্টের শ্রমিক মো. রাসেল বলেন, ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় বছরে দুই দফা বরফকল বন্ধ থাকে। তখন আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে ঋণ করতে হয়। এর মধ্যে কয়েক দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে দিনে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
ট্রলার মালিক মোকছেদ বেপারী বলেন, বরফ না পাওয়ায় তার দুটি ট্রলারে থাকা প্রায় ৩৫ জন জেলেকে নিয়ে সাগরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইলিশের ভরা মৌসুমে সঠিক সময়ে সাগরে যেতে না পারলে মাছ ধরার সুযোগ কমে যায় এবং এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
দীপ্তি চৈতী আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার মো. নাজমুল বলেন, ৮ থেকে ৯ দিন ধরে তারা স্বাভাবিকভাবে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। অথচ বরফ উৎপাদনে প্রায় ১৬ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন। ফলে ট্রলার মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী বরফ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, চলতি মাসে বিদ্যুৎ বিল এসেছে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। অথচ শ্রমিকদের বেতনও এখনো পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ স্বাভাবিক থাকলে প্রতিদিন ১ থেকে দেড় লাখ টাকার বরফ বিক্রি করা সম্ভব হতো। লোডশেডিংয়ের কারণে কয়েক দিনে তাদের প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
রমনা আইস প্ল্যান্টের স্বত্বাধিকারী মনজ হালদার বলেন, একসময় পাড়েরহাটে ১০টি বরফকল থাকলেও বিভিন্ন সমস্যায় বর্তমানে দুটি টিকে আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুটি কল চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টায় মাত্র প্রায় ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর দুই ঘণ্টা না থাকায় তৈরি করা বরফ গলে যাচ্ছে। এতে কয়েক দিনে প্রায় ৯ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
এদিকে বিদ্যুৎ বিল নিয়েও স্থানীয় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, কয়েক মাস আগের তুলনায় বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল প্রায় দ্বিগুণ এসেছে। পাড়েরহাট ইউনিয়নের টগড়া গ্রামের চা দোকানি মো. বাদশা হাওলাদার জানান, আগে তার দোকানের বিল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এলেও বর্তমানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিল আসছে।
পিরোজপুর পৌরসভার মাছিমপুর এলাকার ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেনও বিদ্যুৎ সংকট ও অতিরিক্ত বিল নিয়ে সমস্যার কথা জানান। তার দাবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
তবে বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. আলতাপ হোসেন বলেন, গত সপ্তাহে সারাদেশে লোডশেডিং ছিল। এলএনজি টার্মিনালে সমস্যার কারণে পাইপলাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। তবে ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি সঠিক নয়। এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। গত দুই দিন আংশিক লোডশেডিং থাকলেও বর্তমানে কোনো লোডশেডিং নেই বলে দাবি করেন তিনি।
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো গ্রাহকের বিল বেশি এলে বিষয়টি জানালে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। বিদ্যুৎ বিল ইচ্ছামতো বাড়ানো বা কমানোর কোনো সুযোগ নেই।

































