নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ: গৃহায়নমন্ত্রী

নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ: গৃহায়নমন্ত্রী গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের

বিশেষ প্রতিনিধি

Published : ১৫:৩৭, ৮ অক্টোবর ২০২৬

দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন ব্যবস্থাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবন নির্মাণে স্থাপত্য, কাঠামোগত ও বৈদ্যুতিক পরিকল্পনা সমন্বয় করে অনুমোদন এবং নির্মাণ শেষে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এসব কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নগর ও আবাসন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে এরই মধ্যে বেশ কিছু কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এখন আর্কিটেকচার, স্ট্রাকচারাল ও ইলেক্ট্রো প্ল্যানিং সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

মন্ত্রী বলেন, কোনো ভবনের নকশা অনুমোদনের পর নির্মাণকাজে সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। এ জন্য অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ডিজাইনারদের মাধ্যমে ভবনটি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে কি না, তা প্রত্যয়নের ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় গত সাত মাস ধরে নগর উন্নয়ন ও আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন কাজ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রস্তাব ও সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা

জাকারিয়া তাহের জানান, আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইউডিডি) প্রথমবারের মতো ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের কাজ করা হবে।

প্রথম পর্যায়ে মেট্রোপলিটন শহরগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপর বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকার জন্য বাস্তবভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রতিটি এলাকার প্রয়োজন ও সম্ভাবনা বিবেচনা করে কোথায় আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা অন্যান্য ধরনের স্থাপনা থাকবে, তা নির্ধারণ করে জোনিং করা হবে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা লক্ষ্যহীনভাবে এগিয়ে যাওয়ার মতো। পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। এ কারণে ইউডিডিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য

জাকারিয়া তাহের বলেন, সঠিক পরিকল্পনা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জনসংখ্যা, বসতি, আবাসন ও নগরায়ণের বর্তমান চিত্র জানতে নতুন করে উপযুক্ত শুমারি প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে তৈরি করা সম্ভব হবে।

ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজধানীর ধানমন্ডিসহ রাজউক ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় রাজউকের মাধ্যমে ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে অনেক এলাকায় অনুমোদিত পরিকল্পনা ছাড়া ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভবন চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

গুলশান-বনানী-বারিধারায় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা

রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল এলাকার পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, গুলশান, বনানী ও বারিধারায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি বাড়িঘর রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাড়িতে নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল করা হয়নি। একইভাবে অনেক বড় ডেভেলপার ভবন নির্মাণ করলেও বর্জ্য পরিশোধনের জন্য স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপি স্থাপন করেনি।

এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব বৈঠকে রাজউক চেয়ারম্যান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।

জাকারিয়া তাহের বলেন, গুলশান ও বারিধারার মতো এলাকাগুলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষায়িত এলাকা। এসব এলাকার লেকের পানি ও পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব না হলে সার্বিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা উন্নত করাও কঠিন হবে।

ছয়টি নতুন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি

নগর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে নতুন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠনের কথাও জানান গৃহায়নমন্ত্রী।

তিনি বলেন, রাজউকের আদলে গত সাত মাসে ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশালে ছয়টি নতুন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে আরও চারটি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ছিল। পর্যায়ক্রমে বগুড়াসহ অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, কোনো এলাকায় ডেভেলপমেন্ট অথরিটি না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকেই নকশা অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের বিষয়কে একটি সামগ্রিক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় রোধে নতুন বিধিমালা

অনুমোদিত নকশা ছাড়া নির্মিত ভবন কিংবা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত স্থাপনার বিষয়ে নতুন বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান জাকারিয়া তাহের।

তিনি বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে বিধিমালাটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। এটি অনুমোদিত হলে ভবন নির্মাণ ও তদারকির আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে গুরুত্ব

মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে ৩০ বছর মেয়াদি মর্টগেজ সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থা ছাড়া বৃহৎ পরিসরে আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন।

এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত এগিয়ে এলে সরকার সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।

বেসরকারি আবাসন খাতের নীতিমালায় পরিবর্তনের কথাও জানান জাকারিয়া তাহের। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় নির্ধারিত পরিকল্পনা ও শর্তের মধ্যে থেকেই বেসরকারি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার চ্যালেঞ্জ

ঢাকার বাসযোগ্যতা প্রসঙ্গে গৃহায়নমন্ত্রী বলেন, বাসযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। অতিরিক্ত জনঘনত্বের কারণে রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তোলা সহজ নয়। এজন্য পরিকল্পনার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

গত ৫ অক্টোবর বসতি দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীও বাংলাদেশের আবাসন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা বেশি চ্যালেঞ্জিং।

জাকারিয়া তাহের বলেন, পরিবেশ রক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জনবান্ধব আবাসন নীতি বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণও জরুরি।

মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখলে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement