বাব আল-মানদেব দখলে হুতিরা, লোহিত সাগরে বাড়ল নতুন সংকট
Published : ১৭:৪১, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালি দখল করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হুতিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং সৌদি আরবের তেল পরিবহনের ওপরও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
একসময় ইয়েমেনের তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন একটি ধর্মীয় ও সামরিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত হুতিরা বর্তমানে দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশ এবং উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজধানী সানাও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এখনো দেশটির বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
নব্বইয়ের দশকে জায়দি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করে হুতিরা। ইয়েমেনের দরিদ্র উত্তরাঞ্চলে জায়দিদের বড় একটি অংশের বসবাস। সংগঠনটি ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। সংগঠনের নামটি ধর্মীয় নেতা বদরেদ্দিন আল-হুতির নাম থেকে এসেছে। তার ছেলে হুসেইন আল-হুতি আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন এবং ২০০৪ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত হন।
পরে বদরেদ্দিনের আরেক ছেলে আবদুলমালিক আল-হুতি সংগঠনের নেতৃত্ব নেন। তার নেতৃত্বে উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী ধীরে ধীরে বড় সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া আবদুলমালিকের নেতৃত্বেই হুতিরা রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে।
বর্তমানে হুতিদের হাতে হাজার হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা রয়েছে। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের সংঘাতের অভিজ্ঞতা তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতার কারণে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও তারা বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠেছে।
২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ছয় দফা যুদ্ধে জড়ায় হুতিরা। ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গেও সংঘাতে জড়ায় তারা। সে সময় হুতিদের যোদ্ধারা সৌদি সীমান্ত অতিক্রম করে দেশটির ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিল।
আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনেও অংশ নেয় হুতিরা। পরে সালেহর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক জোট তৈরি হলেও সেই সম্পর্ক টেকেনি। ২০১৭ সালে হুতিরা সালেহকে হত্যা করে।
হুতিদের সবচেয়ে বড় উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। ওই বছর তারা রাজধানী সানা দখল করলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট দ্রুত গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়। দীর্ঘ সংঘাতে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়।
২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের যুদ্ধবিরতি হলেও উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণেই থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে আবারও সংঘাত বাড়তে থাকে।
ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্কও সময়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তারা তেহরান-সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ হিসেবে পরিচিত। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের ইরানের সমর্থনপুষ্ট সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তেহরান হুতিদের অস্ত্র সরবরাহ করে—এমন অভিযোগও রয়েছে, যদিও ইরান তা অস্বীকার করে এসেছে।
তবে হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে তাদের ‘চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে স্বীকার করে না। সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে তেহরানের ওপর নির্ভরশীল হলেও নিজেদের কর্মকাণ্ডে কিছুটা স্বাধীনতা বজায় রেখেছে সংগঠনটি।
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে বিভিন্ন জাহাজে হামলা শুরু করে হুতিরা। তাদের দাবি ছিল, এসব জাহাজের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক রয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানাতেই তারা হামলা চালাচ্ছে। হুতিদের আক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে অনেক আন্তর্জাতিক জাহাজকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে হুতিরা। তবে এসব হামলায় ইসরায়েলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লোহিত সাগর ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যিক যোগাযোগের পথ। সুয়েজ খালের মাধ্যমে এই জলপথ বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরবের জন্যও লোহিত সাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে তেল রপ্তানি ও পরিবহনের ক্ষেত্রে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা গত জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথ অবরোধের ঘোষণা দেয়। এরপর লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালানো হয়। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ৩ সেপ্টেম্বর বাব আল-মানদেব নিয়ন্ত্রণে নিতে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে হুতিরা।
দাবি অনুযায়ী, এক সপ্তাহের মধ্যেই লোহিত সাগরের পুরো উপকূল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির ভেতর ও আশপাশের কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচলের ওপর প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতাও হুতিদের আরও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বাব আল-মানদেবের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তাই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

































