বাদামতলীতে ট্রাকপ্রতি ২ হাজার টাকা চাঁদা, মাসে কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ

বাদামতলীতে ট্রাকপ্রতি ২ হাজার টাকা চাঁদা, মাসে কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৫:৩৪, ১২ আগস্ট ২০২৬

পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়তে আসা ট্রাক থেকে সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফলভর্তি একটি ট্রাক থেকে ২ হাজার টাকা এবং খালি ট্রাক থেকে ১ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। বড় কনটেইনারবাহী লরি থেকে নেওয়া হচ্ছে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী, ওই পার্কিং ইয়ার্ডে ট্রাক, বাস ও কাভার্ড ভ্যান রাখার ফি মাত্র ১০০ টাকা। অথচ বাস্তবে ট্রাকচালকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ১ থেকে ২ হাজার টাকা।

চালকদের অভিযোগ, টাকা না দিলে মারধরের ভয় দেখানো হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে তাঁদের। তবে এসব টাকার কোনো রশিদও দেওয়া হয় না।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গাতীরের বাদামতলী ঘাটসংলগ্ন পার্কিং ইয়ার্ডে একসঙ্গে ৬০ থেকে ৭০টি ফলের ট্রাক রাখা যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতিদিন সেখানে দেড় শতাধিক ট্রাক আসে। প্রতিটি ট্রাক থেকে গড়ে ২ হাজার টাকা আদায় হলে দৈনিক প্রায় ৩ লাখ টাকা এবং মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকা ওঠে। খালি ট্রাক ও অন্যান্য আদায়ের হিসাব ধরলে মাসিক চাঁদার পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

শুধু ট্রাক নয়, পার্কিং ইয়ার্ডের চা ও খাবারের দোকান থেকেও প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে প্রায় ৭০টি দোকান রয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারি ইজারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ

২০১৯ সালে উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গার তীরের জায়গাটি উদ্ধার করে বিআইডব্লিউটিএ। পরে সেখানে ওয়াকওয়ে, সীমানাপ্রাচীর ও পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়। প্রতিবছর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে জায়গাটি ইজারা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে পার্কিং ইয়ার্ডটি এক বছরের জন্য ৯৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় ইজারা নেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের মধ্যপাড়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবদুল করিম ওরফে করিম হাজি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে গেলে স্থানীয় শ্রমিক দল ও যুবদলের কয়েকজন নেতা পার্কিং ইয়ার্ডটির নিয়ন্ত্রণ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, আদালতে মামলা চলমান থাকায় নতুন করে ইজারা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আদালতের নির্দেশে পুরোনো ইজারার মেয়াদ মাসে মাসে বাড়ানো হচ্ছে। নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই বলেও জানান তিনি।

‘আমরা ছয়জন টাকা তুলি’

পার্কিং ইয়ার্ডে টাকা সংগ্রহকারীদের একজন সোহরাব হোসেন নিজেকে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা ছয়জন মিলে টাকা সংগ্রহ করেন এবং পরে তা ‘ওপর মহলে’ পাঠিয়ে দেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, পার্কিং ইয়ার্ড নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে শ্রমিক দল ও যুবদলের কয়েকজন স্থানীয় নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট নেতাদের একজন সুমন ভূঁইয়া দাবি করেন, আওয়ামী লীগ নেতা করিম হাজি আত্মগোপনে যাওয়ার পর তিনি তাঁদের কাছে পার্কিং পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন এবং বিআইডব্লিউটিএকে বিষয়টি জানিয়েছেন।

চাঁদার টাকা শেষ পর্যন্ত যাচ্ছে ফলের দামে

বাদামতলী দেশের অন্যতম বড় পাইকারি ফলের বাজার। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্রাক পার্কিং ও বিভিন্ন পর্যায়ের চাঁদার টাকা শেষ পর্যন্ত ফলের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত খরচের বোঝা গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাদামতলীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ফলের বেচাকেনা হয়। তাই পরিবহন ও পার্কিংয়ের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধ না হলে এর প্রভাব বাজারের ফলের দামেও পড়বে।

 

শেয়ার করুনঃ
Advertisement